Blog
ডায়াবেটিস কেন হয় ?

ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যেটা একদিনে তৈরি হয় না। এটি কোনো হঠাৎ দুর্ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা কিছু ভুল অভ্যাস, ভুল খাবার এবং ভুল জীবনযাপনের ফল। অনেক সময় মানুষ বলে—
“আমি তো হঠাৎ করেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে গেছি।”
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডায়াবেটিস “হঠাৎ ধরা পড়ে না”, “হঠাৎ তৈরি হয় না”।
ডায়াবেটিস কীভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হয়?
ডায়াবেটিস সাধারণত হঠাৎ করে শুরু হয় না; এটি ধীরে ধীরে, অনেক বছর ধরে শরীরের ভেতরে তৈরি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ডায়াবেটিস একটি মেটাবলিক ডিসঅর্ডার, অর্থাৎ শরীর যেভাবে খাবারকে হজম করে শক্তিতে রূপান্তর করে, সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে গোলযোগ জমতে থাকে। আমরা প্রতিদিন যা খাই, তা গ্লুকোজে ভেঙে রক্তে যায় এবং ইনসুলিন হরমোনের সাহায্যে সেই গ্লুকোজ কোষের ভেতরে ঢুকে শক্তি তৈরি করে। কিন্তু এই ব্যবস্থাটাই ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে।
শুরুতে শরীরে ইনসুলিন তৈরি হলেও সেটি ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দেয় এবং গ্লুকোজকে নিজের ভেতরে নিতে চায় না। এর কারণে রক্তে গ্লুকোজ জমে থাকে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এই পর্যায়ে শরীর এখনো কিছুটা সামঞ্জস্য বজায় রাখার চেষ্টা করে, তাই তেমন কোনো বড় উপসর্গ চোখে পড়ে না। মানুষ নিজেকে মোটামুটি সুস্থই মনে করে, অথচ ভেতরে ভেতরে বিপাক প্রক্রিয়ায় ক্ষতি জমতে থাকে।
এই নীরব পর্যায়টিকেই বলা যায় Silent Metabolic Damage। এই সময়েই ডায়াবেটিসের বীজ রোপিত হয়। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ভেতরে ভেতরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়তে থাকে, অগ্ন্যাশয়ের ওপর চাপ পড়ে এবং একসময় শরীর আর এই ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে না। তখনই ডায়াবেটিস স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। এই কারণেই ডায়াবেটিসকে বোঝার জন্য এর গভীরে গিয়ে মূল কারণগুলো জানা খুব জরুরি—যেগুলো ধাপে ধাপে এই নীরব ক্ষতির জন্য দায়ী।
১. অতিরিক্ত চিনি ও রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট
অতিরিক্ত চিনি ও রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেটকে ডায়াবেটিসের নম্বর–১ Root Cause বলা হয়, কারণ এগুলো সরাসরি শরীরের রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট বলতে এমন খাবারকে বোঝায় যেগুলো প্রক্রিয়াজাত করার সময় প্রাকৃতিক ফাইবার ও পুষ্টিগুণ প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। যেমন সাদা ভাত, সাদা আটা বা ময়দা, চিনি, বিস্কুট, কেক, সফট ড্রিংক ও নানা ধরনের প্যাকেটজাত খাবার। এসব খাবার দেখতে সহজ ও সুস্বাদু হলেও শরীরের জন্য একটি বড় সমস্যা তৈরি করে।
এই ধরনের খাবারের মূল সমস্যা হলো—এগুলো খুব দ্রুত হজম হয়ে সরাসরি গ্লুকোজে পরিণত হয়। ফলে খাবার খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অগ্ন্যাশয়কে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ইনসুলিন নিঃসরণ করতে হয়, যেন অতিরিক্ত গ্লুকোজ রক্ত থেকে কোষে প্রবেশ করতে পারে। শুরুতে শরীর এই চাপ সামলে নেয়, কিন্তু যখন বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিন এই অবস্থা চলতে থাকে, তখন ইনসুলিন উৎপাদনকারী অঙ্গ এবং শরীরের কোষগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
বারবার অতিরিক্ত ইনসুলিন নিঃসরণের ফলে ধীরে ধীরে কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি আগ্রহ হারাতে শুরু করে। অর্থাৎ ইনসুলিন থাকা সত্ত্বেও কোষ তা ঠিকভাবে গ্রহণ করে না। এই অবস্থাকেই বলা হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। তখন রক্তে শর্করা স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে যায় এবং এক সময় শরীর যেন বলেই বসে—“আমি আর ইনসুলিনের কথা শুনছি না।” এখান থেকেই ধীরে ধীরে টাইপ–২ ডায়াবেটিসের সূচনা হয়।
২. প্রাকৃতিক ফ্যাটকে ভয় পাওয়া (ভুলধারণা)
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে ফ্যাট মানেই ক্ষতিকর—ফ্যাট খেলেই ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা ওজন বাড়ে। বাস্তবে এই ধারণাটি শুধু আংশিক নয়, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল। সমস্যা প্রাকৃতিক ফ্যাটে নয়, সমস্যা শুরু হয় ভুল ধরনের ফ্যাট বেছে নেওয়া থেকে।
প্রকৃতপক্ষে ঘি, সরিষার তেল বা নারিকেল তেলের মতো প্রাকৃতিক ফ্যাট শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়। এগুলো শরীরকে স্থায়ী শক্তি দেয়, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং কোষের গঠন মজবুত রাখে। কিন্তু ভুল তথ্যের কারণে আমরা এই প্রাকৃতিক ফ্যাটগুলো বাদ দিই এবং তার পরিবর্তে নিয়মিতভাবে রিফাইন্ড তেল, ট্রান্স ফ্যাট ও হাইড্রোজেনেটেড তেল গ্রহণ করতে শুরু করি।
এই রিফাইন্ড ও প্রসেসড তেলগুলোতে প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ প্রায় নেই বললেই চলে। দীর্ঘদিন এসব তেল খেলে কোষের মেমব্রেন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইনসুলিন রিসেপ্টর ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে ইনসুলিন শরীরে থাকলেও কোষ তা গ্রহণ করতে চায় না। এর ফল হিসেবে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি ধীরে ধীরে কমে যায়, যা টাইপ–২ ডায়াবেটিসের প্রধান ভিত্তি তৈরি করে।
অন্যদিকে, প্রাকৃতিক ফ্যাটকে ভয় পেয়ে দীর্ঘদিন এড়িয়ে চললে শরীর প্রয়োজনীয় ভালো ফ্যাট থেকে বঞ্চিত হয়। তখন শরীরের মেটাবলিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এই ভুল খাদ্যাভ্যাসই ডায়াবেটিসের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, ডায়াবেটিসের পথ তৈরি হয় প্রাকৃতিক ফ্যাট খাওয়ার কারণে নয়, বরং প্রাকৃতিক ফ্যাট বাদ দিয়ে নিয়মিত রিফাইন্ড ও ক্ষতিকর তেল ব্যবহারের কারণে।
৩. শারীরিক পরিশ্রমের অভাব (Sedentary Lifestyle)
মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা, হাঁটা ও পরিশ্রমের জন্যই তৈরি। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকা আমাদের শরীরের স্বাভাবিক গঠন ও কাজের ধারার সাথে মানানসই নয়। কিন্তু আধুনিক জীবনে পড়াশোনা, অফিসের কাজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনের কারণে অধিকাংশ মানুষকে দিনের বড় একটি সময় বসে কাটাতে হয়। গাড়ি বা লিফট ব্যবহার, হাঁটার অভাব এবং ব্যায়ামের জন্য আলাদা সময় না রাখার ফলে শারীরিক পরিশ্রম প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শরীরের মেটাবলিজমে। শারীরিকভাবে সক্রিয় না থাকলে মাংসপেশিগুলো শক্তি উৎপাদনের জন্য রক্তের গ্লুকোজ ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না। ফলে গ্লুকোজ কোষে না ঢুকে রক্তেই জমে থাকে। এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শরীরকে বারবার বেশি ইনসুলিন উৎপাদন করতে হয়, যার ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তৈরি হয় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, যা টাইপ–২ ডায়াবেটিসের প্রধান ভিত্তি।
শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে আরেকটি বড় সমস্যা হলো পেটের ভিসারাল ফ্যাট জমা হওয়া। এই ভেতরের চর্বি শুধু ওজনই বাড়ায় না, বরং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং ইনসুলিনের কাজকে আরও বাধাগ্রস্ত করে। তাই দীর্ঘদিনের বসে থাকা জীবনযাপন ও শরীরচর্চার অভাব ডায়াবেটিসের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ট্রিগারগুলোর একটি হিসেবে কাজ করে।
৪. দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস ও কম ঘুম
দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস ও কম ঘুম ডায়াবেটিসের একটি বড় কিন্তু সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত কারণ। আধুনিক জীবনে আমরা অনেকেই নিয়মিত মানসিক চাপের মধ্যে থাকি—কাজের চাপ, অর্থনৈতিক চিন্তা, পারিবারিক দুশ্চিন্তা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। এসব স্ট্রেস যখন সাময়িক হয়, তখন শরীর তা সামলে নিতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন এই চাপ প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে যায়।
স্ট্রেস হলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই একটি হরমোন নিঃসরণ করে, যার নাম কর্টিসল (Cortisol)। এই হরমোনের মূল কাজ হলো শরীরকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখা, যাকে বলা হয় “Fight or Flight” অবস্থা। এই সময় কর্টিসল রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যাতে শরীর দ্রুত শক্তি পায় এবং সংকট মোকাবিলা করতে পারে। সাময়িক স্ট্রেসে এটি উপকারী হলেও, দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রেস চলতে থাকলে কর্টিসল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় উচ্চ অবস্থায় থাকে।
যখন প্রতিদিন মানসিক চাপ, চিন্তা, অফিসের কাজের চাপ বা পারিবারিক টেনশন চলতেই থাকে, তখন শরীর ধরে নেয় যে সে সবসময় বিপদের মধ্যে আছে। এর ফলে কর্টিসল ক্রমাগত নিঃসৃত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রাও দীর্ঘসময় উঁচু থাকে। এই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শরীরের কোষগুলোকে ইনসুলিনের প্রতি অসংবেদনশীল করে তোলে, যা ডায়াবেটিসের পথ প্রশস্ত করে।
এই অবস্থাকে আরও খারাপ করে দেয় কম ঘুম। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ঠিকমতো রিকভার করতে পারে না। কম ঘুম ইনসুলিন সেনসিটিভিটি কমিয়ে দেয়, অর্থাৎ শরীর ইনসুলিনের কাজ ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। পাশাপাশি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হয়। বিশেষ করে Ghrelin হরমোন বেড়ে যায়, যা ক্ষুধা বাড়ায় এবং অপ্রয়োজনীয় খাওয়ার প্রবণতা তৈরি করে। এর ফল হিসেবে মানুষ বেশি কার্বোহাইড্রেট ও মিষ্টি খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা রক্তে শর্করা আরও বাড়িয়ে দেয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস এবং নিয়মিত কম ঘুম একসঙ্গে শরীরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই কারণেই বলা হয়—স্ট্রেস ও ঘুমের অভাব একসঙ্গে থাকলে তা ডায়াবেটিসের দিকে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ ও দ্রুত রাস্তা তৈরি করে।
৫. অন্ত্রের স্বাস্থ্য(Gut Health) খারাপ হওয়া
আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসের পেছনে সবচেয়ে গভীর ও অবহেলিত একটি কারণ হলো অন্ত্রের স্বাস্থ্য বা Gut Health খারাপ হয়ে যাওয়া। আমাদের অন্ত্র শুধু খাবার হজমের জায়গা নয়; এটি আসলে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। মানুষের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন উপকারী ব্যাকটেরিয়া বসবাস করে, যাদেরকে একসাথে বলা হয় গাট মাইক্রোবায়োম। এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো হজমে সাহায্য করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখে এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিন্তু দীর্ঘদিনের কিছু ভুল অভ্যাসের কারণে এই গাট মাইক্রোবায়োম ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার খাওয়া, বেশি চিনি গ্রহণ, অপ্রয়োজনীয় বা বারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এবং খাবারে পর্যাপ্ত ফাইবারের অভাব অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে কমিয়ে দেয়। এর ফলে অন্ত্রে প্রদাহ বা Gut Inflammation তৈরি হয় এবং অন্ত্রের দেয়াল দুর্বল হয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় Leaky Gut। এই অবস্থায় ক্ষতিকর উপাদান সহজেই রক্তে প্রবেশ করে এবং শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ইনফ্লেমেশন সৃষ্টি করে।
এই ইনফ্লেমেশনের সরাসরি প্রভাব পড়ে ইনসুলিনের কাজে। কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে যায়, অর্থাৎ ইনসুলিন সেনসিটিভিটি কমে যায়। ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। আজকের গবেষণা তাই স্পষ্টভাবে বলছে—
👉 খারাপ গাট মানেই বেশি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, আর বেশি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স মানেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি।
এই কারণেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা এখন আধুনিক চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ডায়াবেটিস কি শুধু জেনেটিক কারণে হয়?
ডায়াবেটিস কি শুধু জেনেটিক কারণে হয়—এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো না। জেনেটিক ফ্যাক্টর থাকলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে, কিন্তু শুধু জেনেটিক কারণেই সাধারণত ডায়াবেটিস প্রকাশ পায় না।
একটি সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। বলা যায়, জেনেটিক ফ্যাক্টর বন্দুকটি লোড করে, অর্থাৎ পারিবারিক ইতিহাস শরীরে একটি সম্ভাবনা তৈরি করে রাখে। কিন্তু লাইফস্টাইল সেই বন্দুকের ট্রিগার টানে। ভুল খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা এবং অতিরিক্ত ওজন—এই বিষয়গুলোই মূলত সেই ট্রিগার হিসেবে কাজ করে।
অনেক মানুষ আছেন যাদের পরিবারে ডায়াবেটিস আছে, কিন্তু তারা সুষম খাবার খান, নিয়মিত হাঁটেন বা ব্যায়াম করেন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং স্ট্রেস ম্যানেজ করেন—ফলে তাদের কখনো ডায়াবেটিস হয় না। আবার একই জেনেটিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা সত্ত্বেও যারা দীর্ঘদিন অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেন, তাদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস দ্রুত প্রকাশ পায়।
অর্থাৎ ডায়াবেটিসকে শুধু বংশগত রোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জেনেটিক ফ্যাক্টর ঝুঁকি বাড়ায় ঠিকই, কিন্তু ভুল জীবনযাপনই ডায়াবেটিসকে বাস্তবে রূপ দেয়। তাই লাইফস্টাইল সচেতনভাবে ঠিক রাখতে পারলে, জেনেটিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা অনেকাংশে বিলম্বিত করা সম্ভব।
ডায়াবেটিস কেন এত বাড়ছে?
বর্তমান সময়ে ডায়াবেটিস যেভাবে দ্রুত বাড়ছে, তার পেছনে মূল কারণ কোনো একক বিষয় নয়—বরং আমাদের পুরো জীবনযাপনের ধরনটাই বদলে যাওয়া। আগের দিনের তুলনায় খাবারের মান ও ধরন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। ঘরে রান্না করা প্রাকৃতিক খাবারের জায়গা দখল করেছে প্রসেসড খাবার, পরিশোধিত চিনি, সাদা আটা ও প্যাকেটজাত খাদ্য, যেগুলো রক্তে শর্করা খুব দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।
একই সঙ্গে মানুষের চলাফেরা ও শারীরিক পরিশ্রম ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আগে দৈনন্দিন কাজেই শরীর নড়াচড়া করত, এখন দীর্ঘ সময় বসে থাকা, গাড়ি ব্যবহার ও স্ক্রিনভিত্তিক কাজ শরীরকে নিষ্ক্রিয় করে তুলেছে। এতে মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায় এবং শরীর গ্লুকোজ ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না।
এর পাশাপাশি আধুনিক জীবনের মানসিক চাপ ও স্ট্রেস অনেক বেড়েছে। কাজ, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়ায়, যা সরাসরি রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি করে। আবার স্ট্রেসের সঙ্গে যোগ হয়েছে ঘুমের অভাব। অনিয়মিত জীবনযাপন ও রাত জাগার ফলে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি কমে যায়, ক্ষুধা ও শর্করা নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
সবশেষে, আমরা ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক জীবনযাপন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। সূর্যালোক, প্রকৃতির সংস্পর্শ, সঠিক সময়ের খাবার ও বিশ্রাম—এসবের অভাব শরীরের স্বাভাবিক ছন্দকে ভেঙে দেয়। এসব কারণ মিলিয়েই ডায়াবেটিস আজ একটি ব্যক্তিগত রোগ নয়, বরং একটি লাইফস্টাইল ডিজিজে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ জীবনযাপনের ধরণ যতক্ষণ না বদলানো হচ্ছে, ততক্ষণ এই রোগের বিস্তার থামানো কঠিন।
তাহলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ সম্ভব?
হ্যাঁ—ডায়াবেটিস প্রতিরোধ একেবারেই সম্ভব, বিশেষ করে টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে। কারণ এই রোগের বড় অংশটাই জীবনযাপনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যদি দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস সচেতনভাবে ঠিক করা যায়, তাহলে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
প্রথমত, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট কমানো অত্যন্ত জরুরি। সাদা ভাত, ময়দা, চিনি ও অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ায় এবং দীর্ঘদিন ধরে এগুলো খেলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। এগুলোর পরিবর্তে আঁশযুক্ত, কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নিলে রক্তে সুগার তুলনামূলকভাবে স্থির থাকে।
দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক ফ্যাট গ্রহণ করা দরকার। ঘি, সরিষার তেল বা নারিকেল তেলের মতো প্রাকৃতিক ফ্যাট শরীরের হরমোন ব্যালান্স ও কোষের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন শুধু রিফাইন্ড তেল খেলে এই সংবেদনশীলতা কমে যেতে পারে, যা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
তৃতীয়ত, নিয়মিত হাঁটা ও শারীরিক চলাফেরা ডায়াবেটিস প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী উপায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করলে মাংসপেশি বেশি গ্লুকোজ ব্যবহার করে, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহজ হয়।
চতুর্থত, স্ট্রেস ও ঘুম ঠিক রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও কম ঘুম শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়ায়, যা সরাসরি রক্তে সুগার বৃদ্ধি করে। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখলে ইনসুলিন ভালোভাবে কাজ করতে পারে।
সবশেষে, গাট হেলথ বা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা প্রয়োজন। ভালো হজম, পর্যাপ্ত ফাইবারযুক্ত খাবার ও উপকারী ব্যাকটেরিয়া সমৃদ্ধ অন্ত্র ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে সাহায্য করে। গাট হেলথ ভালো থাকলে শরীরের মেটাবলিজমও সঠিকভাবে কাজ করে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ কোনো কঠিন বা অসম্ভব বিষয় নয়। ছোট ছোট কিন্তু ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই এই রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
শেষকথা
ডায়াবেটিস কোনো একদিনে তৈরি হওয়া রোগ নয়। এটি ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা ভুল খাবার, অনিয়মিত জীবনযাপন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মানসিক চাপ ও ঘুমের সমস্যার সম্মিলিত ফল। শরীর অনেক আগেই সংকেত দিতে শুরু করে, কিন্তু আমরা সেগুলো উপেক্ষা করি। যখন রক্তে শর্করার মাত্রা স্থায়ীভাবে বেড়ে যায়, তখন শরীর যেন আমাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—এভাবে আর চলতে দেওয়া যাবে না।
ভালো খবর হলো, ডায়াবেটিস মানেই শেষ নয়। যেসব অভ্যাস এই রোগকে তৈরি করেছে—অতিরিক্ত চিনি ও প্রসেসড খাবার, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, অনিয়মিত ঘুম ও স্ট্রেস—সেগুলো ধীরে ধীরে বদলালে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সচেতন খাবার নির্বাচন, নিয়মিত চলাফেরা, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখলে শরীর আবার ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে ফিরতে শুরু করে। অর্থাৎ, ডায়াবেটিস হলো শরীরের দেওয়া একটি সতর্ক সংকেত—জীবনযাপন ঠিক করলে এর নিয়ন্ত্রণও আমাদের হাতেই থাকে।











