Blog
রোজায় কেন পানিশূন্যতা বেশি হয়? এর লক্ষণ, কারণ ও সতর্কতা জেনে নিন

রমজান মাস মূলত ইবাদত, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ সময়, যেখানে মানুষ শারীরিক চাহিদার পাশাপাশি মানসিক ও আত্মিক উন্নতির দিকে মনোযোগ দেয়। তবে বাস্তব জীবনে দেখা যায়, এই পবিত্র মাসেই অনেক মানুষ একটি খুব সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার মুখোমুখি হন—পানিশূন্যতা। দীর্ঘ সময় না খেয়ে ও পানি না পান করে থাকার কারণে শরীর ধীরে ধীরে পানির ঘাটতির দিকে চলে যায়, যার ফলে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, মুখ ও ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া, এমনকি প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ রোজার সময় অনেকের কাছেই পরিচিত অভিজ্ঞতা।
এই কারণেই অনেক মানুষ ধরে নেন যে রোজা মানেই এই ধরনের কষ্ট স্বাভাবিক এবং এড়ানোর উপায় নেই। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, রোজায় পানিশূন্যতা হওয়া পুরোপুরি অনিবার্য নয়। এটি অনেকটাই নির্ভর করে আমরা কীভাবে ইফতার ও সেহরির সময় নিজেদের যত্ন নিচ্ছি, কী খাবার বেছে নিচ্ছি এবং কীভাবে পানি পান করছি তার ওপর। সঠিক পরিকল্পনা, সচেতন খাবার নির্বাচন ও কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে রোজার সময়ও শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা সম্ভব এবং এই মাসটি ইবাদতের পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতার একটি সুন্দর সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
পানিশূন্যতা বলতে কী বোঝায়?
পানিশূন্যতা এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে শরীর তার স্বাভাবিক কাজ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি ও ইলেকট্রোলাইট—যেমন সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ—পায় না। অনেকেই মনে করেন পানি শুধু তৃষ্ণা মেটানোর জন্য দরকার, কিন্তু বাস্তবতা হলো পানি শরীরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
শরীরে পর্যাপ্ত পানি থাকলে রক্ত সহজে প্রবাহিত হয় এবং অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান দ্রুত বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছাতে পারে। পানি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে, কারণ ঘামের মাধ্যমে অতিরিক্ত তাপ বের করে দেয়। হজমের ক্ষেত্রেও পানি অত্যন্ত জরুরি—এটি খাবার ভাঙতে, পুষ্টি শোষণে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে সাহায্য করে। পাশাপাশি কিডনি ও লিভার পানি ব্যবহার করেই শরীরের বর্জ্য ও টক্সিন ছেঁকে প্রস্রাব ও অন্যান্য পথে বের করে দেয়। এমনকি মস্তিষ্কের মনোযোগ, স্মৃতি এবং পেশির স্বাভাবিক সংকোচন–প্রসারণেও পানির ভূমিকা অপরিহার্য।
রোজার সময় যখন দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে নতুন করে পানি প্রবেশ করে না, তখন এই স্বাভাবিক কার্যক্রমগুলো বজায় রাখার জন্য শরীরকে জমে থাকা পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। গরম, ঘাম, শারীরিক পরিশ্রম বা ভুল খাবারের কারণে যদি সেই পানি দ্রুত ক্ষয় হয় এবং ইফতার–সেহরিতে তা যথাযথভাবে পূরণ না করা হয়, তাহলে শরীর সহজেই পানিশূন্য অবস্থায় চলে যায়। এ কারণেই রোজার সময় সচেতনভাবে পানি ও পানিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোজায় কেন পানিশূন্যতা বেশি হয়?
১. দীর্ঘ সময় পানি পান না করা
রোজার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—সুবহে সাদিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত শরীরে নতুন করে কোনো পানি প্রবেশ করে না। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে শরীর স্বাভাবিকভাবেই নানা উপায়ে পানি হারাতে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে, প্রস্রাবের সময়, এমনকি খুব বেশি নড়াচড়া না করলেও ত্বক দিয়ে অল্প অল্প করে পানি বের হয়। গরমের সময় এই পানির ক্ষয় আরও দ্রুত ঘটে, কারণ ঘামের মাধ্যমে শরীর অতিরিক্ত তাপ বের করতে চেষ্টা করে।
রোজার সময় যদি দিনগুলো দীর্ঘ হয়, অর্থাৎ সুবহে সাদিক থেকে মাগরিব পর্যন্ত ব্যবধান বেশি হয়, তাহলে শরীরকে আরও বেশি সময় কোনো পানির সহায়তা ছাড়াই চলতে হয়। ফলে শরীরে পানির ঘাটতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। সাধারণ দিনে আমরা তৃষ্ণা পেলেই পানি খেয়ে এই ঘাটতি পূরণ করতে পারি, কিন্তু রোজার সময় সেই সুযোগ থাকে না। এ কারণেই সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া রোজায় পানিশূন্যতা তৈরি হওয়া খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। সচেতন না হলে এই পানির ঘাটতি শরীরে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও ক্লান্তির মতো সমস্যার জন্ম দিতে পারে।
২. ঘামের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যাওয়া
রোজার সময় শরীর থেকে পানির ক্ষয় হওয়ার একটি বড় কারণ হলো অতিরিক্ত ঘাম। বিশেষ করে যারা গরমে বাইরে কাজ করেন, দীর্ঘ সময় রান্নাঘরে থাকেন বা শারীরিকভাবে পরিশ্রম করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি দেখা যায়। গরম পরিবেশে শরীর নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ঘামের মাধ্যমে পানি বের করে দেয়। এটি স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া হলেও রোজার সময় এখানে একটি সমস্যা তৈরি হয়।
কারণ, এই ঘামের মাধ্যমে যে পরিমাণ পানি শরীর থেকে বের হয়ে যায়, তা দিনের বেলায় পূরণ করার কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে শরীর ধীরে ধীরে পানির ঘাটতিতে চলে যায়। যদি ইফতার ও সেহরির সময় এই পানির ক্ষয় সঠিকভাবে পূরণ না করা হয়—অর্থাৎ পর্যাপ্ত পানি পান না করা হয় এবং পানি ধরে রাখতে সহায়ক খাবার না খাওয়া হয়—তাহলে শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন তৈরি হয়। এর ফল হিসেবে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ক্লান্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই রোজার সময় ঘামের মাধ্যমে হওয়া পানির ক্ষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সচেতনভাবে পানি ও খাবার গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
৩. ইফতার ও সেহরিতে ভুল খাবার নির্বাচন
অনেক সময় অজান্তেই আমরা এমন খাবার বেছে নিই, যেগুলো রোজার সময় শরীরের জন্য উপকারের বদলে উল্টো ক্ষতি করে। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, বেশি লবণাক্ত খাবার, খুব বেশি চিনি দেওয়া শরবত কিংবা বিভিন্ন ধরনের প্রসেসড খাবার হজম করতে শরীরকে বেশি পানি ব্যবহার করতে হয়। ফলে শরীরের ভেতর থেকে পানি দ্রুত কমে যেতে থাকে।
এই ধরনের খাবার খেলে তৃষ্ণার অনুভূতিও বেড়ে যায়। লবণ শরীরের কোষ থেকে পানি টেনে নেয়, আর অতিরিক্ত চিনি রক্তে শর্করার ওঠানামার কারণে আরও তৃষ্ণা তৈরি করে। আবার ভাজাপোড়া ও প্রসেসড খাবার হজমে ভারী হওয়ায় শরীরের পানি ধরে রাখার স্বাভাবিক ক্ষমতাও কমে যায়। এর ফল হিসেবে সারাদিন মুখ শুকনো লাগে, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা অনুভূত হতে পারে। তাই রোজার সময় এসব খাবার সীমিত রেখে হালকা, স্বাভাবিক ও পানি-সমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়াই শরীরকে হাইড্রেটেড রাখার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
৪. চা, কফি ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়
রোজার সময় ইফতারের পর অনেকেই অভ্যাসবশত চা বা কফি পান করেন, কারণ এতে সাময়িকভাবে ক্লান্তি কমে এবং সতেজ লাগতে পারে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন একটি ডাইইউরেটিক উপাদান। ডাইইউরেটিক মানে এমন কিছু, যা কিডনিকে বেশি প্রস্রাব তৈরি করতে উদ্দীপিত করে।
এর ফলে শরীরে ঢোকা পানির একটি বড় অংশ দ্রুত প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। অর্থাৎ, চা বা কফি পান করার সময় আপনি যতটুকু তরল গ্রহণ করছেন, তার পুরোটা শরীর ধরে রাখতে পারে না। তাই শুরুতে একটু আরাম বা চাঙ্গা লাগলেও কিছু সময় পর শরীর আবার তৃষ্ণা অনুভব করে, মুখ শুকিয়ে যায় এবং পানিশূন্যতা আরও বেড়ে যায়।
বিশেষ করে রোজার দিনে, যখন শরীর ইতোমধ্যেই দীর্ঘ সময় পানির ঘাটতির মধ্যে থাকে, তখন ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এই ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ইফতারের পর নিয়মিত চা বা কফির পরিবর্তে পানি, লেবু পানি বা অন্য হালকা ও প্রাকৃতিক পানীয় বেছে নেওয়া শরীরকে বেশি হাইড্রেটেড ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
৫. সেহরিতে পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া
অনেক মানুষ সেহরির সময় ঠিকভাবে পানি পান করার দিকে তেমন গুরুত্ব দেন না। কেউ কেউ ঘুম ভাঙিয়েই তাড়াহুড়ো করে সামান্য খাবার খেয়ে নেন, আবার অনেকে শুধু খাবার খেয়ে কোনো পানি না খেয়েই দ্রুত আবার ঘুমাতে চলে যান। এর ফলে শরীর সারাদিনের জন্য যে পরিমাণ পানি জমা বা ধরে রাখার সুযোগ পায়, তা তৈরি হয় না।
সেহরির সময়ই মূলত শরীরের সামনে একমাত্র সুযোগ থাকে দীর্ঘ সময়ের রোজার আগে পানি শোষণ করে নিজের ভেতরে একটি পানির ভারসাম্য তৈরি করার। এই সময় পর্যাপ্ত পানি না খেলে শরীর প্রয়োজনীয় হাইড্রেশন রিজার্ভ গড়ে তুলতে পারে না। ফলস্বরূপ রোজার মাঝামাঝি সময় থেকেই অতিরিক্ত তৃষ্ণা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। তাই সেহরিতে শুধু খাবার নয়, পরিকল্পিতভাবে পর্যাপ্ত পানি পান করা রোজার সময় সুস্থ ও স্বস্তিতে থাকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৬. বয়স ও শারীরিক অবস্থার প্রভাব
বয়স্ক মানুষদের শরীরে পানির ঘাটতি তুলনামূলকভাবে দ্রুত তৈরি হয়, কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের মোট পানির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায় এবং তৃষ্ণা অনুভব করার ক্ষমতাও অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শরীর পানির অভাবের সংকেত দিলেও তা ঠিকভাবে বোঝা যায় না। একই সঙ্গে কিডনির কার্যক্ষমতা বয়সের সাথে ধীরে ধীরে কমে, যার কারণে শরীর প্রয়োজনীয় পানি ধরে রাখতে পারে না এবং অল্প সময়েই পানিশূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ডায়াবেটিস থাকলে এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়। রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি হলে শরীর অতিরিক্ত শর্করা বের করার জন্য বেশি প্রস্রাব তৈরি করে, এতে শরীর থেকে পানি দ্রুত বের হয়ে যায়। আবার কিডনি সমস্যায় ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে কিডনি ঠিকভাবে পানি ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে না, ফলে রোজার সময় পানির ঘাটতি দ্রুত তৈরি হতে পারে। এছাড়া কিছু ওষুধ—বিশেষ করে যেগুলো প্রস্রাব বাড়ায় বা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়—সেগুলোও শরীর থেকে পানি বের করে দেয়। এসব কারণে বয়স্ক মানুষ, ডায়াবেটিস ও কিডনি সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের রোজার সময় পানিশূন্যতার বিষয়ে বেশি সচেতন ও সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।
রোজায় পানিশূন্যতার লক্ষণগুলো কী?
পানিশূন্যতা সাধারণত এক মুহূর্তে তীব্র আকার ধারণ করে না; এটি ধীরে ধীরে শরীরে গড়ে ওঠে। শুরুতে লক্ষণগুলো খুব হালকা থাকায় অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে পানির ঘাটতি বাড়তে থাকলে এই লক্ষণগুলো তীব্র রূপ নিতে পারে এবং তখন তা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শুরুতে শরীর পানির অভাব বোঝাতে কিছু সাধারণ সংকেত দেয়। অতিরিক্ত তৃষ্ণা লাগা তার অন্যতম প্রথম লক্ষণ। এর সাথে মুখ ও ঠোঁট শুষ্ক হয়ে যায়, কারণ শরীর প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না। মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরার অনুভূতি হয়, কারণ রক্তে পানির পরিমাণ কমে গেলে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে না। অনেকেই এই সময় সারাদিন দুর্বল ও ক্লান্ত বোধ করেন। এছাড়া প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায় এবং প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হয়ে ওঠে—এগুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
যদি এই অবস্থাকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে পানিশূন্যতা আরও গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তখন চোখে ঝাপসা দেখা শুরু হয়, বুক ধড়ফড় করতে পারে এবং স্বাভাবিক কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে মাথা হালকা লাগা বা অজ্ঞান হওয়ার উপক্রমও হতে পারে, যা তাৎক্ষণিকভাবে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এই কারণেই পানিশূন্যতার লক্ষণগুলোকে কখনোই হালকা করে দেখা উচিত নয়। শরীর যখন এসব সংকেত দেয়, তখনই সতর্ক হওয়া জরুরি। সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব এবং শরীরকে আবার স্বাভাবিক ও নিরাপদ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়।
পানিশূন্যতা হলে কী কী ঝুঁকি তৈরি হয়?
দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে এর প্রভাব শুধু তৃষ্ণা বা সাময়িক দুর্বলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ–প্রত্যঙ্গ ক্ষতির মুখে পড়ে। পর্যাপ্ত পানি না থাকলে রক্ত ঘন হয়ে যায়, ফলে রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কমে যেতে পারে। এতে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং হঠাৎ অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
পানিশূন্যতার আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে কিডনির ওপর। কিডনি শরীর থেকে বর্জ্য ও টক্সিন বের করতে পর্যাপ্ত পানির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ সময় পানি কম থাকলে কিডনিকে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়, যা ভবিষ্যতে কিডনি সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অন্ত্রে পর্যাপ্ত পানি না পৌঁছালে মল শক্ত হয়ে যায়, ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস ও বদহজমের মতো হজমজনিত সমস্যা দেখা দেয়।
পানি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পানিশূন্য অবস্থায় শরীর ঘাম ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, ফলে অতিরিক্ত গরম অনুভব করা, ক্লান্তি বা অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা আরও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করতে পারে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
রমজান মাসে এসব শারীরিক অসুবিধা শুধু স্বাস্থ্যের ওপরই প্রভাব ফেলে না, বরং ইবাদতের মনোযোগেও ব্যাঘাত ঘটায়। দুর্বলতা, মাথাব্যথা বা অস্বস্তি থাকলে মন একাগ্র রাখা কঠিন হয়। তাই রোজার সময় পানিশূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হতে দেওয়া উচিত নয়; বরং সচেতনভাবে পানি ও খাবার গ্রহণের মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ ও সতেজ রাখাই সর্বোত্তম।
কারা রোজায় বেশি পানিশূন্যতার ঝুঁকিতে থাকেন?
রোজার সময় কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, তাই তাদের বিশেষভাবে সতর্ক হওয়া জরুরি। বয়স্ক ব্যক্তিদের শরীরে বয়সের কারণে পানির চাহিদা বোঝার ক্ষমতা কমে যায় এবং কিডনির কার্যকারিতাও কিছুটা দুর্বল থাকে। ফলে অল্প সময়েই পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার ওঠানামার সঙ্গে পানির ভারসাম্যের সরাসরি সম্পর্ক আছে। পানিশূন্যতা হলে তাদের সুগার লেভেল আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।
যাদের কিডনি বা হৃদরোগ আছে, তাদের শরীরে পানি ও লবণের ভারসাম্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। রোজায় যদি পানি অতিরিক্ত কমে যায়, তাহলে কিডনি ও হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। আবার যারা রোদে কাজ করেন বা নিয়মিত ভারী শারীরিক শ্রম দেন, তাদের শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে বেশি পানি বের হয়ে যায়। এই পানির ঘাটতি সময়মতো পূরণ না হলে দ্রুত ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়।
এ ছাড়া যারা নিয়মিত ডাইইউরেটিক জাতীয় ওষুধ সেবন করেন, সেই ওষুধগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে শরীর থেকে পানি বের করে দেয়। রোজার সময় এ ধরনের ওষুধের প্রভাব আরও বেশি অনুভূত হতে পারে। এসব কারণেই এই শ্রেণির মানুষদের জন্য রোজা রাখা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। রোজা শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে নিজের শারীরিক অবস্থার উপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় এবং অপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো যায়।
রোজায় পানিশূন্যতা এড়াতে কী বিষয়ে সতর্ক থাকবেন?
১. ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পানির পরিকল্পনা রাখুন
রোজার সময় শরীর দীর্ঘক্ষণ পানি পায় না, তাই ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়টুকুই হলো শরীরকে আবার হাইড্রেট করার একমাত্র সুযোগ। এই সময় একবারে অনেক পানি খেলে শরীর তা ঠিকভাবে শোষণ করতে পারে না। অতিরিক্ত পানি দ্রুত প্রস্রাব হয়ে বের হয়ে যায়, ফলে পানিশূন্যতা আসলে পূরণ হয় না।
সবচেয়ে ভালো উপায় হলো—এই সময়টাকে ভাগ করে নেওয়া। ইফতারের সময় অল্প পানি পান করে শুরু করা, এরপর নামাজ বা খাবারের ফাঁকে ফাঁকে ধীরে ধীরে পানি খাওয়া এবং সেহরিতে আবার পর্যাপ্ত পানি পান করা। এতে শরীর পানি শোষণ করার সময় পায় এবং দীর্ঘ সময় তা ধরে রাখতে পারে। এমন পরিকল্পিতভাবে পানি পান করলে রোজার দিনে তৃষ্ণা, মাথা ঘোরা ও দুর্বলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
২. পানি – সমৃদ্ধ খাবার বেছে নিন
রোজার সময় শরীরে পানির ঘাটতি শুধু পানি কম খাওয়ার কারণে নয়, বরং খাবারের মাধ্যমেও শরীর কতটা পানি ধরে রাখতে পারছে তার উপর নির্ভর করে। ফল, শাকসবজি, দই ও স্যুপের মতো পানি-সমৃদ্ধ খাবারে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর পানি, আঁশ ও মিনারেল থাকে। এই উপাদানগুলো শরীরের ভেতরে পানি শোষণ করে ধীরে ধীরে ছাড়ে, ফলে দীর্ঘ সময় শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং অতিরিক্ত তৃষ্ণা কমে যায়।
এছাড়া এসব খাবার হজমে সহজ, শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে এবং ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখে। ইফতার ও সেহরিতে নিয়মিত পানি-সমৃদ্ধ খাবার রাখলে শরীর শুধু তাৎক্ষণিকভাবে নয়, বরং সারাদিনের জন্য প্রয়োজনীয় পানির ঘাটতি সামলাতে পারে। তাই রোজায় পানিশূন্যতা কমাতে শুধু পানি পান করাই নয়, সচেতনভাবে এমন খাবার বেছে নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাস।
৩. অতিরিক্ত লবণ ও চিনি কমান
রোজার সময় অতিরিক্ত লবণ ও চিনি খেলে শরীরের পানির ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। লবণ বেশি হলে শরীর সেই লবণকে সামাল দিতে কোষ থেকে পানি টেনে নেয়, ফলে তৃষ্ণা বেড়ে যায় এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার বেশি চিনি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ে, যার ফলে শরীর অতিরিক্ত শর্করা বের করতে বেশি প্রস্রাব তৈরি করে—এভাবেও শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পানি বের হয়ে যায়।
বিশেষ করে ইফতারে অতিরিক্ত লবণাক্ত ভাজাপোড়া বা বেশি চিনি দেওয়া শরবত সাময়িক স্বস্তি দিলেও পরে তীব্র তৃষ্ণা, দুর্বলতা ও মুখ শুকিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই রোজায় শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে হলে খাবারে লবণ ও চিনি পরিমিত রাখা জরুরি। এতে শরীর স্বাভাবিকভাবেই পানি ধরে রাখতে পারে এবং রোজার সময় নিজেকে বেশি সতেজ ও স্বস্তিতে রাখা সম্ভব হয়।
৪. চা–কফি সীমিত করুন
চা–কফি পান করার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে, কিন্তু রোজার সময় এতে একটু সতর্ক হওয়া জরুরি—বিশেষ করে সেহরিতে। চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন একটি ডাইইউরেটিক উপাদান, অর্থাৎ এটি প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পানি দ্রুত বের হয়ে যেতে পারে। সেহরির পর দীর্ঘ সময় পানি পান করার সুযোগ না থাকায় এই অতিরিক্ত পানি ক্ষয় সারাদিন ধরে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ায়।
এ ছাড়া ক্যাফেইন শরীরে সাময়িক চাঙাভাব দিলেও পরে ক্লান্তি ও মাথাব্যথা তৈরি করতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি বুক ধড়ফড়, গ্যাস বা এসিডিটির সমস্যাও বাড়ায়, যা রোজার সময় অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তাই রোজায়, বিশেষ করে সেহরিতে, চা–কফি এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ। যদি অভ্যাসগত কারণে খেতেই হয়, তবে ইফতারের পরে সীমিত পরিমাণে নেওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা বেশি উপকারী।
৫. দিনের বেলা অপ্রয়োজনীয় রোদ ও ভারী পরিশ্রম কমান
রোজার সময় দিনের বেলায় অপ্রয়োজনীয় রোদে থাকা ও ভারী শারীরিক পরিশ্রম কমানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোদে বেশি সময় থাকলে বা অতিরিক্ত কাজ করলে শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে দ্রুত পানি বের হয়ে যায়। রোজা অবস্থায় এই হারানো পানি সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করা সম্ভব হয় না, ফলে শরীর দ্রুত পানিশূন্যতার দিকে চলে যায়। এর ফলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই রোজার দিনে সম্ভব হলে ভারী কাজগুলো ইফতারের পরে বা সেহরির আগের সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা ভালো। দিনের বেলায় বাইরে বের হতে হলে ছায়া ব্যবহার করা, হালকা কাপড় পরা এবং অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ এড়িয়ে চলা উচিত। এই ছোট সচেতনতাগুলো মেনে চললে ঘামের পরিমাণ কমে এবং শরীর সারাদিন তুলনামূলকভাবে হাইড্রেটেড থাকতে পারে।
রোজায় পানিশূন্যতা প্রতিরোধ কেন জরুরি?
রোজা শুধু খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি আত্মসংযম, শৃঙ্খলা এবং সুস্থ জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রিত রাখা, যাতে ইবাদত ও দৈনন্দিন কাজ দুটোই স্বাচ্ছন্দ্যে করা যায়। কিন্তু যখন শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হয়, তখন এই উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে শুরু করে।
পানিশূন্যতা রোজাকে সহজ ও স্বাভাবিক রাখার পরিবর্তে কষ্টকর করে তোলে। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব দেখা দেয়—যার ফলে ইবাদতে খুশু নষ্ট হয় এবং দৈনন্দিন কাজেও অসুবিধা হয়। দীর্ঘসময় পানিশূন্যতা চলতে থাকলে এটি কিডনি, হৃদযন্ত্র ও হজমের ওপরও চাপ ফেলতে পারে।
ভালো খবর হলো, রোজায় পানিশূন্যতা অনিবার্য কোনো সমস্যা নয়। সঠিক জ্ঞান, সচেতন খাবার নির্বাচন এবং ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পানি গ্রহণ করলে এই সমস্যার বড় অংশই এড়ানো সম্ভব। তাই পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করা জরুরি—যাতে রোজা হয় শান্ত, শক্তিময় ও সুস্থতার একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা, শুধু কষ্টের নয়।
শেষ কথা
রোজার সময় পানিশূন্যতা বেশি হওয়ার পেছনে খুব স্পষ্ট কিছু কারণ কাজ করে। দীর্ঘ সময় পানি পান না করা রোজার একটি বাস্তবতা, তবে এর সাথে যদি ইফতার ও সেহরিতে ভুল খাবার বেছে নেওয়া হয় এবং দৈনন্দিন অভ্যাসে সচেতনতা না থাকে, তাহলে পানির ঘাটতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। শুরুতে পানিশূন্যতার লক্ষণগুলো অনেক সময় হালকা থাকে—মুখ শুকনো লাগা, সামান্য দুর্বলতা বা মাথা ঝিমুনি। কিন্তু এগুলো উপেক্ষা করা হলে ধীরে ধীরে শরীরের ওপর চাপ বাড়ে এবং ঝুঁকির মাত্রাও বেড়ে যায়।
এই কারণেই সচেতন থাকাই সবচেয়ে বড় সমাধান। সঠিক সময়ে এবং ধাপে ধাপে পানি পান করা, ফলমূল ও শাকসবজির মতো পানি-সমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া, আর শরীরের সংকেতগুলো—যেমন অতিরিক্ত তৃষ্ণা, মাথা ঘোরা বা প্রস্রাবের রঙের পরিবর্তন—সময়মতো বুঝে নেওয়া খুব জরুরি। এসব ছোট ছোট সচেতনতা রোজার সময় শরীরকে হাইড্রেটেড ও শক্তিশালী রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।
রোজা তাই শুধু না খেয়ে থাকার একটি অভ্যাস নয়; এটি নিজেকে শৃঙ্খলার সাথে পরিচালনা করার এবং শরীরের যত্ন নেওয়ারও একটি সুযোগ। ইবাদতের পাশাপাশি যদি আমরা নিজের স্বাস্থ্যের দিকেও যত্নবান হই, তবে রোজা হয়ে উঠতে পারে স্বস্তিদায়ক, প্রাণবন্ত এবং সুস্থতার পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি সুন্দর মাধ্যম।