Blog
রোজায় ওজন কমে নাকি বাড়ে?
রমজান এলেই অনেকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—রোজায় ওজন কমে নাকি বাড়ে? কারণ যুক্তিটা সহজ মনে হয়: সারাদিন না খেলে তো ক্যালোরি কম যাবে, তাই ওজনও কমার কথা। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। রোজায় দিনের বেলায় না খাওয়া হলেও, ইফতার ও সেহরিতে কী এবং কতটা খাচ্ছেন, সেটাই আসলে ফল নির্ধারণ করে।
অনেকে দিনের ক্ষুধা পূরণ করতে গিয়ে ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, মিষ্টি বা ভারী খাবার খান। এতে ক্যালোরি ঘাটতির বদলে ক্যালোরি উদ্বৃত্ত তৈরি হয়, ফলে ওজন বাড়তে পারে। আবার কেউ যদি সুষম খাদ্য গ্রহণ করেন, প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার খান, অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলেন এবং নড়াচড়া বজায় রাখেন, তাহলে ধীরে ধীরে ওজন কমতেও পারে।
এছাড়া ঘুমের মান ও সময়, পর্যাপ্ত পানি পান, স্ট্রেসের মাত্রা এবং শারীরিক কার্যকলাপ—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঘুম কম হলে ক্ষুধা বাড়ে, পানিশূন্যতা হলে অকারণে বেশি খেতে ইচ্ছা করে, আর সারাদিন নিষ্ক্রিয় থাকলে ক্যালোরি বার্ন কমে যায়। তাই রোজা নিজে ওজন কমানো বা বাড়ানোর যন্ত্র নয়—বরং আপনার সামগ্রিক জীবনযাপনই ঠিক করে দেয় শেষ ফলাফল কী হবে।
রোজায় শরীরে কী ঘটে?
রোজা রাখলে শরীর হঠাৎ করে “বন্ধ” হয়ে যায় না; বরং এটি ধাপে ধাপে একটি স্বাভাবিক মেটাবলিক অভিযোজন (metabolic adaptation) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। আমরা যখন খাবার খাই, তখন শরীর প্রধানত গ্লুকোজকে এনার্জি হিসেবে ব্যবহার করে। তাই রোজা শুরু হওয়ার পর প্রথম ৮–১২ ঘণ্টা পর্যন্ত শরীর রক্তে উপস্থিত গ্লুকোজ থেকেই শক্তি নেয়।
এই গ্লুকোজ কমে আসতে থাকলে শরীর দ্বিতীয় ধাপে যায়—লিভারে সঞ্চিত গ্লাইকোজেন ব্যবহার শুরু করে। গ্লাইকোজেন হলো জমা রাখা কার্বোহাইড্রেট, যা শরীর প্রয়োজনের সময় ভেঙে গ্লুকোজে রূপান্তর করে। সাধারণত ১২–২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই মজুদ ধীরে ধীরে কমে আসে।
যখন গ্লুকোজ ও গ্লাইকোজেনের মজুদ কমতে থাকে, তখন শরীর এনার্জির বিকল্প উৎস হিসেবে চর্বি ভাঙা শুরু করে। এটিকেই বলা হয় “ফ্যাট বার্নিং ফেজ”। এই পর্যায়ে শরীর ফ্যাটকে ভেঙে ফ্যাটি অ্যাসিড ও কেটোন তৈরি করে এবং সেগুলো এনার্জি হিসেবে ব্যবহার করে। এ কারণেই অনেকে মনে করেন—রোজা মানেই চর্বি কমে যাওয়া।
তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। কারণ শরীর ফ্যাট ব্যবহার শুরু করলেও, ইফতার ও সেহরিতে যদি অতিরিক্ত ক্যালোরি, চিনি বা ভাজাপোড়া খাওয়া হয়, তাহলে আবার ইনসুলিন বাড়ে এবং শরীর চর্বি জমাতে শুরু করতে পারে। তাই শুধু উপবাস করলেই ওজন কমবে—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। ফলাফল নির্ভর করে পুরো দিনের খাবার, ঘুম, হরমোন ভারসাম্য এবং জীবনযাপনের ওপর।
রোজায় ওজন কমার কারণ
১. ক্যালোরি গ্রহণ কমে গেলে
ওজন নিয়ন্ত্রণের মূল নীতি হলো—আপনি যত ক্যালোরি গ্রহণ করেন এবং যত ক্যালোরি খরচ করেন, তার ভারসাম্য। যদি ইফতার ও সেহরিতে আপনার মোট ক্যালোরি গ্রহণ স্বাভাবিক দিনের তুলনায় কম হয়, তাহলে শরীর একটি “ক্যালোরি ঘাটতি” (Calorie Deficit) অবস্থায় যায়। এই অবস্থায় শরীর প্রয়োজনীয় শক্তির ঘাটতি পূরণ করতে জমা চর্বি ব্যবহার করতে শুরু করে।
রোজায় সারাদিন না খাওয়ার কারণে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবেই মোট ক্যালোরি কমে যায়—বিশেষ করে যদি ইফতার ও সেহরিতে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, মিষ্টি বা উচ্চ-ক্যালোরির খাবার না খাওয়া হয়। তখন শরীর ধীরে ধীরে চর্বি ভেঙে শক্তি উৎপাদন করে, ফলে ওজন কমতে শুরু করে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কেবল না খেয়ে থাকলেই ওজন কমবে এমন নয়। যদি ইফতারে অতিরিক্ত খাওয়া হয় এবং সারাদিনের ঘাটতি একবারেই পুষিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ক্যালোরি ঘাটতি তৈরি হবে না। তাই রোজায় ওজন কমার জন্য প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ও সচেতন খাদ্যাভ্যাস, শুধু উপবাস নয়।
২. দীর্ঘ উপবাসে ফ্যাট বার্নিং
দীর্ঘ সময় উপবাসে থাকলে শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে যায়। ইনসুলিন হলো সেই হরমোন, যা খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করা কোষে প্রবেশ করাতে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত শক্তিকে চর্বি হিসেবে জমা রাখতে ভূমিকা রাখে। যখন আমরা দীর্ঘ সময় কিছু খাই না, তখন ইনসুলিন কম থাকে। এই অবস্থায় শরীর জমা গ্লাইকোজেন (লিভারে সঞ্চিত শক্তি) ব্যবহার করার পর ধীরে ধীরে ফ্যাট ভাঙা শুরু করে।
এই প্রক্রিয়ায় শরীর চর্বিকে ভেঙে ফ্যাটি অ্যাসিড ও কিটোনে রূপান্তর করে, যা এনার্জি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই উপবাসের নির্দিষ্ট সময় পেরুলে শরীর ফ্যাটকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে—যাকে আমরা ফ্যাট বার্নিং বলি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে। যদি ইফতারে অতিরিক্ত ক্যালোরি, বেশি মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাওয়া হয়, তাহলে রক্তে ইনসুলিন দ্রুত বেড়ে যায় এবং শরীর আবার চর্বি জমা করার প্রক্রিয়ায় ফিরে যায়। ফলে উপবাসের সময় যে ফ্যাট ব্যবহার হয়েছিল, তা পুনরায় জমা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
অর্থাৎ, ফ্যাট বার্নিং কার্যকর রাখতে হলে ইফতার ও সেহরিতে পরিমিত, সুষম ও নিয়ন্ত্রিত খাবার খাওয়াই মূল বিষয়।
৩. সচেতন খাদ্যাভ্যাস
রমজানে অনেকেই নিজের খাবারের প্রতি একটু বেশি সচেতন হয়ে ওঠেন। সাধারণ সময়ের মতো অযথা স্ন্যাকস, অতিরিক্ত মিষ্টি বা বারবার খাওয়ার অভ্যাস কমে যায়। ইফতার ও সেহরিকে কেন্দ্র করে খাবার সীমাবদ্ধ থাকে নির্দিষ্ট সময়ে। অনেকেই ভাজাপোড়া কমিয়ে ফল, শাকসবজি, ডাল, প্রোটিন ও পরিমিত কার্বোহাইড্রেট বেছে নেন।
যখন খাবারে অতিরিক্ত চিনি ও তেল কমে যায় এবং সুষম পুষ্টি বাড়ে, তখন শরীর অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরি জমা করে না। রক্তে শর্করার ওঠানামা কম হয়, ইনসুলিন স্থিতিশীল থাকে এবং অতিরিক্ত ক্ষুধা অনুভূত হয় না। ফলে সারাদিনে মোট ক্যালোরি গ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
এই সচেতন খাদ্যাভ্যাস—যেখানে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, সুষম পুষ্টি এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার কম থাকে—ওজন কমানোর জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, শুধু উপবাস নয়; বরং কী খাচ্ছেন এবং কতটা খাচ্ছেন—এই সচেতন পরিবর্তনই ওজন কমার মূল কারণ।
রোজায় ওজন বাড়ার কারণ
রোজায় সারাদিন না খাওয়ার কারণে অনেকেই ভাবেন ওজন নিশ্চয়ই কমবে। কিন্তু বাস্তবে কিছু অভ্যাস ও খাদ্য নির্বাচনের কারণে উল্টো ওজন বেড়ে যেতে পারে। নিচে কারণগুলো একটু বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো—
১. ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া
চপ, পেঁয়াজু, বেগুনি, সমুচা ইত্যাদি খাবার তেলে ডিপ ফ্রাই করা হয়। এগুলোতে উচ্চ ক্যালোরি এবং অনেক সময় ট্রান্স ফ্যাট থাকে। সারাদিন না খাওয়ার পর হঠাৎ এগুলো বেশি খেলে শরীর দ্রুত ক্যালোরি জমা করে ফেলে। কারণ দীর্ঘ উপবাসের পর শরীর শক্তি সংরক্ষণে বেশি সক্রিয় হয়ে যায়। ফলে অতিরিক্ত ক্যালোরি সহজেই চর্বি হিসেবে জমতে শুরু করে।
২. বেশি মিষ্টি ও শরবত
চিনিযুক্ত শরবত, জিলাপি বা অন্যান্য মিষ্টি রক্তে সুগারের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এতে ইনসুলিন হরমোন দ্রুত বাড়ে, যা অতিরিক্ত গ্লুকোজকে ফ্যাট হিসেবে জমা করতে সহায়তা করে। নিয়মিত বেশি মিষ্টি খেলে ফ্যাট জমার প্রবণতা বাড়ে এবং ওজন বৃদ্ধি পায়।
৩. রাতে অতিরিক্ত খাওয়া
ইফতারের পর অনেকে একাধিকবার ভারী খাবার খান—ইফতার, রাতের খাবার, আবার দেরিতে সেহরি। এতে ক্যালোরি গ্রহণ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হয়ে যায়। রাতে মেটাবলিজম তুলনামূলক ধীর থাকায় অতিরিক্ত ক্যালোরি সহজে পোড়ে না; বরং জমে যায়।
৪. শারীরিক নড়াচড়া কমে যাওয়া
রোজায় ক্লান্তির ভয় থেকে অনেকেই পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। কিন্তু নড়াচড়া না করলে ক্যালোরি বার্ন কমে যায়। সারাদিন বসে থাকলে শরীরের শক্তি ব্যবহার কম হয় এবং গ্রহণ করা ক্যালোরি চর্বি হিসেবে জমা হতে পারে।
৫. ঘুমের অভাব
রোজায় ঘুমের রুটিন বদলে যায়। ঘুম কম হলে কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) বাড়ে এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় এবং মেটাবলিজমও প্রভাবিত হয়। ফলস্বরূপ ওজন বাড়তে পারে।
সংক্ষেপে, রোজা নিজে ওজন বাড়ায় না—বরং ইফতার ও সেহরির খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও দৈনন্দিন রুটিনই ওজন বাড়া বা কমার পেছনে মূল ভূমিকা রাখে।
তাহলে রোজায় ওজন কমবে নাকি বাড়বে?
✔ যদি ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ থাকে → ওজন কমতে পারে
রোজার সময় আপনি দিনের বেশিরভাগ সময় না খেয়ে থাকেন, যা স্বাভাবিকভাবেই ক্যালোরি গ্রহণের সুযোগ কমিয়ে দেয়। কিন্তু আসল বিষয় হলো—ইফতার ও সেহরিতে আপনি কতটা এবং কী ধরনের খাবার খাচ্ছেন। যদি মোট ক্যালোরি গ্রহণ আপনার শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে কম থাকে, তাহলে শরীর জমা ফ্যাট ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে ধীরে ধীরে ওজন কমতে পারে। বিশেষ করে সুষম খাবার, কম মিষ্টি, কম ভাজাপোড়া এবং নিয়ন্ত্রিত পরিমাণ খাবার ওজন কমানোর সহায়ক হয়।
❌ যদি ইফতার অতিরিক্ত হয় → ওজন বাড়তে পারে
অন্যদিকে, সারাদিন না খেয়ে থাকার কারণে অনেকে ইফতারে অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন। ভাজাপোড়া, মিষ্টি, শরবত, ভারী রাতের খাবার—এসব মিলিয়ে মোট ক্যালোরি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। তখন শরীর ফ্যাট বার্ন না করে বরং অতিরিক্ত ক্যালোরি চর্বি হিসেবে জমা করে। ফলে রমজান শেষে ওজন বেড়ে যেতে পারে।
👉 অর্থাৎ, রোজা নিজে ওজন বাড়ায় বা কমায় না—আপনার অভ্যাসই ফল নির্ধারণ করে।
রোজা একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে। কিন্তু শেষ ফল নির্ভর করে আপনি কতটা সচেতনভাবে খাদ্য নির্বাচন করছেন, কতটা ক্যালোরি গ্রহণ করছেন, কীভাবে ঘুমাচ্ছেন এবং কতটা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকছেন তার ওপর। সঠিক পরিকল্পনা করলে রোজা ওজন কমানোর সুযোগ হতে পারে; আর অসচেতন হলে এটি ওজন বৃদ্ধির কারণও হতে পারে।
রোজাকে স্বাস্থ্যকর ওজন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বানাতে কী করবেন?
ইফতার শুরু করুন পানি, ১–২টি খেজুর ও ফল দিয়ে — সারাদিন উপবাসের পর শরীর প্রথমে হাইড্রেশন চায়। পানি দ্রুত শরীরকে সতেজ করে এবং ডিহাইড্রেশন কমায়। ১–২টি খেজুর প্রাকৃতিক গ্লুকোজ সরবরাহ করে যা দ্রুত কিন্তু নিয়ন্ত্রিত এনার্জি দেয়। এরপর ফল খেলে ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবার পাওয়া যায়, যা হজম প্রক্রিয়াকে ধীরে ও স্বাভাবিকভাবে চালু করে।
ভাজাপোড়া সীমিত রাখুন — অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবারে ক্যালোরি ও ট্রান্স ফ্যাট বেশি থাকে। এগুলো সাময়িক তৃপ্তি দিলেও দ্রুত এনার্জি ওঠানামা ঘটায় এবং ওজন বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে। তাই পুরোপুরি বাদ না দিলেও পরিমিত রাখা জরুরি।
সেহরিতে প্রোটিন ও আঁশ রাখুন — প্রোটিন (ডিম, ডাল, দই) দীর্ঘ সময় ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে এবং পেশি রক্ষা করে। আঁশযুক্ত খাবার (শাকসবজি, ওটস, লাল চাল) ধীরে হজম হয়, ফলে রক্তে শর্করা স্থিতিশীল থাকে এবং দুপুরের আগে দুর্বলতা কম হয়।
রাতের খাবার হালকা রাখুন — ইফতারের পর অতিরিক্ত ভারী খাবার খেলে ক্যালোরি বেড়ে যায় এবং হজমে চাপ পড়ে। হালকা ও সুষম খাবার শরীরকে ভারী না করে স্থিতিশীল এনার্জি দেয়।
ইফতারের পর ১৫–২০ মিনিট হাঁটুন — হালকা হাঁটা হজম উন্নত করে, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি জমতে বাধা দেয়।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন — ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ধাপে ধাপে পানি পান করা জরুরি। পানিশূন্যতা অনেক সময় ক্ষুধা হিসেবে অনুভূত হয়, তাই সঠিক হাইড্রেশন এনার্জি ও ওজন নিয়ন্ত্রণ দুটোই সহজ করে।
রোজায় ফ্যাট বার্নিং কি সত্যি?
হ্যাঁ, রোজার সময় শরীরে ফ্যাট বার্নিং বা চর্বি ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে—কিন্তু এটি স্বয়ংক্রিয় বা নিশ্চয়তাপূর্ণ নয়। এর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ হওয়া প্রয়োজন।
রোজায় দীর্ঘ সময় খাবার গ্রহণ না করলে শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা কমে যায়। ইনসুলিন হলো এমন একটি হরমোন যা মূলত শরীরে শক্তি সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে। যখন ইনসুলিন বেশি থাকে, তখন শরীর সহজে ফ্যাট ভাঙে না; বরং চর্বি জমাতে সাহায্য করে। কিন্তু উপবাসের সময় ইনসুলিন কমে গেলে শরীর বিকল্প শক্তির উৎস হিসেবে জমে থাকা চর্বি ব্যবহার করতে পারে। এটিকেই আমরা ফ্যাট বার্নিং বলি।
তবে সমস্যা শুরু হয় ইফতারের সময়। যদি ইফতারে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি, ভাজাপোড়া বা উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবার বেশি পরিমাণে খাওয়া হয়, তাহলে রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যায়। এর ফলে ইনসুলিন হঠাৎ বৃদ্ধি পায়, এবং শরীর আবার চর্বি সংরক্ষণের মোডে চলে যায়। এতে দিনের উপবাসে যে ফ্যাট ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা ব্যাহত হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্যালোরি উদ্বৃত্ত। যদি ইফতার ও সেহরিতে মিলিয়ে আপনার দৈনিক ক্যালোরি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তাহলে শরীর অতিরিক্ত ক্যালোরি ফ্যাট হিসেবে জমা রাখে। সে ক্ষেত্রে উপবাস থাকা সত্ত্বেও ওজন কমার বদলে বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, রোজায় ফ্যাট বার্নিং সম্ভব—যদি ইনসুলিন কম রাখা যায়, চিনি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং মোট ক্যালোরি সুষম থাকে। অন্যথায়, রোজা রেখেও শরীরে ফ্যাট জমা হতে পারে। তাই সঠিক খাদ্য নির্বাচন ও পরিমিত খাবার গ্রহণই আসল চাবিকাঠি।
শেষ কথা
রোজায় ওজন কমবে নাকি বাড়বে—এটি মূলত আপনার দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে। রোজা নিজে কোনো জাদুকরি প্রক্রিয়া নয় যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওজন কমিয়ে দেবে। বরং এটি একটি কাঠামোবদ্ধ সময়সূচি দেয়, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া ও না খাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই সময়কে যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে রমজান হতে পারে শরীরের মেটাবলিজম পুনর্গঠনের একটি কার্যকর সুযোগ।
যদি ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টি খাওয়া হয়, রাত জেগে ভারী খাবার খাওয়া হয় এবং সারাদিন নিষ্ক্রিয় থাকা হয়—তাহলে ওজন বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু যদি সচেতনভাবে সুষম খাবার বেছে নেওয়া হয়, অতিরিক্ত ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং নিয়মিত হালকা শারীরিক কার্যকলাপ বজায় রাখা হয়, তাহলে রোজা ফ্যাট কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সুষম সেহরি দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখতে সহায়ক, নিয়ন্ত্রিত ইফতার অতিরিক্ত ক্যালোরি জমতে দেয় না, আর হালকা ব্যায়াম মেটাবলিজম সক্রিয় রাখে। এই চারটি অভ্যাস—সচেতন খাদ্যাভ্যাস, পরিকল্পিত সেহরি, নিয়ন্ত্রিত ইফতার এবং নিয়মিত নড়াচড়া—স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার মূল ভিত্তি।
রমজান তাই শুধু উপবাসের মাস নয়; এটি নিজের শরীর ও অভ্যাসকে নতুনভাবে গড়ার একটি বাস্তব সুযোগ।