Blog
ইনফ্ল্যামেশন কমাতে দৈনন্দিন Anti-Inflammatory খাবারের তালিকা
ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ আসলে শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া। যখন শরীরে কোনো আঘাত লাগে, সংক্রমণ হয় বা ক্ষতিকর জীবাণু প্রবেশ করে, তখন শরীর সেই ক্ষতি ঠিক করার জন্য একটি প্রতিরোধ প্রক্রিয়া শুরু করে। এর ফলেই আক্রান্ত স্থানে লালচে ভাব, ব্যথা, ফোলা বা গরম অনুভূত হতে পারে। এই ধরনের স্বল্পমেয়াদি প্রদাহ শরীরের জন্য উপকারী, কারণ এটি ক্ষত সারাতে ও জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই প্রদাহ দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে স্থায়ী হয়ে যায়। একে বলা হয় ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন (chronic inflammation)। এটি অনেক সময় ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে চলতে থাকে এবং বাইরে থেকে তেমন কোনো লক্ষণ বোঝা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থায় থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সাথে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতা, গ্যাস্ট্রিক সমস্যা, জয়েন্ট পেইনসহ অনেক লাইফস্টাইল রোগের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ শরীরের ভেতরে ক্রমাগত প্রদাহ থাকলে এসব রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে ইতিবাচক বিষয় হলো—সচেতন খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই প্রদাহ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষ কিছু প্রাকৃতিক খাবার, যেমন রঙিন শাকসবজি, ফল, হলুদ, আদা, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে। এগুলোকে সাধারণভাবে Anti-inflammatory খাবার বলা হয়।
তাই দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এই ধরনের খাবার নিয়মিত রাখলে শরীরের ভেতরের প্রদাহের মাত্রা কমাতে সাহায্য পাওয়া যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব।
১. রঙিন শাক-সবজি
পালং শাক, লাল শাক, ব্রকলি, গাজর এবং বেল পেপারের মতো রঙিন শাকসবজিতে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট থাকে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের ভেতরে তৈরি হওয়া ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালকে কমাতে সাহায্য করে। এই ফ্রি র্যাডিক্যাল বেশি হলে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ (chronic inflammation) তৈরি হতে পারে, যা ধীরে ধীরে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট হলো উদ্ভিজ্জ খাবারের বিশেষ উপাদান, যা শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং কোষকে সুরক্ষা দেয়।
রঙিন শাকসবজির প্রতিটি রঙের পেছনে আলাদা ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে। যেমন—সবুজ শাকে থাকে ক্লোরোফিল ও ফলেট, গাজরে থাকে বিটা-ক্যারোটিন, আর লাল বা হলুদ সবজিতে থাকে বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তাই প্রতিদিন বিভিন্ন রঙের সবজি খেলে শরীর নানা ধরনের পুষ্টি পায় এবং প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে।
এ কারণে প্রতিদিনের খাবারে অন্তত ১–২ বাটি মিশ্র সবজি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে হজম ভালো থাকে, শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে।
২. বেরি ও অন্যান্য ফল
বেরি জাতীয় ফল এবং কিছু রঙিন ফল শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী, বিশেষ করে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন কমাতে। ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি, আঙুর ও ডালিমের মতো ফলগুলোতে প্রচুর পলিফেনল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এই উপাদানগুলো শরীরে তৈরি হওয়া ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালকে কমাতে সাহায্য করে, যা দীর্ঘমেয়াদে কোষের ক্ষতি ও প্রদাহ বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে ডালিম ও আঙুরে থাকা পলিফেনল হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং শরীরের কোষকে সুরক্ষা দেয়। বেরি জাতীয় ফলগুলোতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে এবং শরীরের স্বাভাবিক প্রদাহ প্রতিরোধ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে।
তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন ধরনের ফল রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মৌসুমি ফল যেমন—আঙুর, ডালিম, পেয়ারা, কমলা বা অন্যান্য রঙিন ফল প্রতিদিন ১–২ সার্ভিং খেলে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পায়। এতে শরীরের প্রদাহ কমতে সাহায্য করে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।
৩. হলুদ (কারকিউমিন)
হলুদ আমাদের রান্নাঘরের খুব পরিচিত একটি মসলা, কিন্তু এর ভেতরে থাকা প্রধান সক্রিয় উপাদান কারকিউমিন (Curcumin) শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কারকিউমিনকে শক্তিশালী Anti-inflammatory ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর অর্থ হলো—এটি শরীরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা প্রদাহ (chronic inflammation) কমাতে সাহায্য করতে পারে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পরিমিত হলুদ গ্রহণ করলে জয়েন্টের ব্যথা, হজমের সমস্যা এবং বিভিন্ন মেটাবলিক সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কারকিউমিন শরীরে সহজে শোষিত হয় না। এজন্য অনেক পুষ্টিবিদ পরামর্শ দেন হলুদকে গোলমরিচের সাথে খেতে। গোলমরিচে থাকা একটি উপাদান পাইপারিন (Piperine) কারকিউমিনের শোষণ কয়েকগুণ বাড়াতে সাহায্য করে। তাই রান্নায় যখন হলুদ ব্যবহার করা হয় এবং সাথে সামান্য গোলমরিচ থাকে, তখন শরীর কারকিউমিন থেকে বেশি উপকার পেতে পারে।
প্রতিদিনের রান্নায় ডাল, সবজি বা তরকারিতে পরিমিত পরিমাণ হলুদ ব্যবহার করা সহজ একটি উপায়। এতে শুধু খাবারের রং ও স্বাদই বাড়ে না, বরং শরীরের প্রদাহ কমাতেও সহায়ক হতে পারে। তবে অতিরিক্ত নয়—স্বাভাবিক রান্নার পরিমাণেই হলুদ ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো।
৪. আদা ও রসুন
আদা ও রসুন শুধু রান্নার স্বাদ বাড়ানোর উপাদান নয়, বরং এগুলো শক্তিশালী প্রাকৃতিক ঔষধি গুণসম্পন্ন খাবার হিসেবেও পরিচিত। আদায় রয়েছে জিঞ্জারল (Gingerol) এবং রসুনে রয়েছে অ্যালিসিন (Allicin) নামক বায়োঅ্যাক্টিভ যৌগ, যা শরীরের প্রদাহ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই উপাদানগুলো শরীরের কোষে তৈরি হওয়া ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল কমাতে সাহায্য করে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করে।
নিয়মিত আদা ও রসুন খেলে হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয়, গ্যাস ও অস্বস্তি কমে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে ঠান্ডা-কাশি, গলা ব্যথা বা হালকা সংক্রমণের সময় আদা ও রসুন উপকারী বলে অনেক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিদিনের খাবারে সহজভাবেই এগুলো যুক্ত করা যায়। যেমন—ডাল, স্যুপ, সবজি বা বিভিন্ন রান্নায় সামান্য আদা ও রসুন ব্যবহার করলে তা শুধু খাবারের স্বাদই বাড়ায় না, বরং শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। নিয়মিত ও পরিমিত ব্যবহারই এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায়।
৫. স্বাস্থ্যকর ফ্যাট
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন লক্ষ্য থাকে ইনফ্ল্যামেশন বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমানো। সব ধরনের চর্বি শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং কিছু ভালো ফ্যাট আছে যা কোষের স্বাস্থ্য রক্ষা করে, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে।
যেমন—অলিভ অয়েল, সরিষার তেল (পরিমিত পরিমাণে), বাদাম ও তিল—এসব খাবারে থাকে মনোআনস্যাচুরেটেড ও পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট। এই ধরনের ফ্যাট শরীরের কোষকে সুরক্ষা দেয় এবং প্রদাহজনিত রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া বাদাম ও তিলে ভিটামিন-ই ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে।
অন্যদিকে, ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত ভাজা খাবার শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এগুলো রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ, হৃদরোগ ও মেটাবলিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই দৈনন্দিন খাবারে স্বাস্থ্যকর তেল ও প্রাকৃতিক ফ্যাট ব্যবহার করা ভালো, তবে অবশ্যই পরিমিত পরিমাণে।
সংক্ষেপে বলা যায়—সঠিক ধরনের ফ্যাট বেছে নেওয়া শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৬. ফ্যাটি ফিশ
চর্বিযুক্ত মাছ যেমন ইলিশ, সালমন ও সার্ডিন শরীরের জন্য খুবই উপকারী, কারণ এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। ওমেগা-৩ একটি স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, যা শরীরের ভেতরে থাকা প্রদাহ (Inflammation) কমাতে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন ধরে শরীরে প্রদাহ থাকলে হৃদরোগ, জয়েন্টের ব্যথা, ডায়াবেটিস এবং নানা মেটাবলিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিয়মিত ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার খেলে এই প্রদাহের মাত্রা কমাতে সহায়তা পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরের প্রদাহজনিত রাসায়নিক উপাদানগুলোর কার্যকলাপ কমাতে সাহায্য করে এবং কোষকে সুরক্ষা দেয়। এছাড়া এটি হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, রক্তে চর্বির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে এবং মস্তিষ্কের জন্যও উপকারী।
তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে সপ্তাহে অন্তত ২–৩ দিন চর্বিযুক্ত মাছ রাখা ভালো। এতে শরীর প্রয়োজনীয় ওমেগা-৩ পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ ও বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
৭. ডাল ও পূর্ণ শস্য
মসুর ডাল, ছোলা, ওটস, লাল চাল বা অন্যান্য পূর্ণ শস্যজাত খাবার আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এসব খাবারে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার (আঁশ), ভিটামিন, মিনারেল এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিন থাকে, যা হজম প্রক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করে। ফাইবার অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে পুষ্টি জোগায়, ফলে গাট হেলথ বা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। যখন অন্ত্রের পরিবেশ সুস্থ থাকে, তখন শরীরের প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন কমানোর প্রক্রিয়াও সহজ হয়।
পূর্ণ শস্য ও ডাল জাতীয় খাবার ধীরে হজম হয়, তাই এগুলো রক্তে শর্করা ধীরে বাড়ায় এবং দীর্ঘ সময় তৃপ্তি দেয়। এর ফলে হঠাৎ ক্ষুধা লাগা বা অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতাও কমে। একই সঙ্গে এই ধরনের খাবার অন্ত্রের চলাচল স্বাভাবিক রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে এবং শরীরের ভেতরের প্রদাহ কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অন্তত এক সার্ভিং পূর্ণ শস্য বা ডালজাতীয় খাবার রাখা ভালো। যেমন—এক বাটি ডাল, অল্প পরিমাণ লাল চালের ভাত, বা ওটসের নাশতা। নিয়মিত এসব খাবার খেলে হজম শক্তি ভালো থাকে এবং শরীর দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে সহায়তা পায়।
৮. দই ও প্রোবায়োটিক
আমাদের অন্ত্রে লক্ষ লক্ষ উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাস করে, যাদের সম্মিলিতভাবে গাট মাইক্রোবায়োম বলা হয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো হজম প্রক্রিয়া ঠিক রাখা, পুষ্টি শোষণ করা এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন অন্ত্রে উপকারী ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, তখন শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রোবায়োটিক খাবার, যেমন টক দই, এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোর সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে হজম ভালো হয়, অন্ত্রের পরিবেশ সুস্থ থাকে এবং শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্রোবায়োটিক গ্রহণ করলে গাট হেলথ উন্নত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রদাহ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পরিমিত পরিমাণে টক দই বা অন্য প্রোবায়োটিক খাবার রাখলে হজম শক্তি বাড়ে, অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন?
শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ বাড়ার পেছনে খাদ্যাভ্যাস বড় ভূমিকা রাখে। কিছু খাবার নিয়মিত বেশি পরিমাণে খেলে শরীরে প্রদাহের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। তাই সুস্থ থাকতে এসব খাবার নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত চিনি:
অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এতে ইনসুলিনের ওপর চাপ পড়ে এবং শরীরে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া বাড়তে পারে। নিয়মিত বেশি মিষ্টি খেলে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
প্রক্রিয়াজাত খাবার (Processed Food):
ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ইনস্ট্যান্ট খাবার ইত্যাদিতে সাধারণত অতিরিক্ত লবণ, চিনি, কৃত্রিম উপাদান ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট থাকে। এসব উপাদান শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়াকে ব্যাহত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ইনফ্ল্যামেশন বাড়াতে পারে।
সফট ড্রিঙ্কস:
কার্বোনেটেড সফট ড্রিঙ্কস বা মিষ্টি পানীয়তে উচ্চমাত্রার চিনি থাকে। এগুলো রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ায় এবং লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন নিয়মিত সফট ড্রিঙ্কস পান করলে মেটাবলিক সমস্যা ও প্রদাহ বাড়ার ঝুঁকি দেখা যায়।
অতিরিক্ত লাল মাংস:
গরু বা খাসির মাংস পরিমিত খেলে সমস্যা হয় না, তবে অতিরিক্ত খেলে শরীরে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা বাড়তে পারে। এর ফলে হৃদরোগ ও প্রদাহজনিত সমস্যা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
ট্রান্স ফ্যাট:
ডিপ ফ্রাই করা খাবার, বেকারি পণ্য ও কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবারে ট্রান্স ফ্যাট থাকতে পারে। এই ফ্যাট শরীরের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বলে ধরা হয়। এটি খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ায় এবং শরীরে ইনফ্ল্যামেশন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সুস্থ থাকতে তাই এসব খাবার সম্পূর্ণ বাদ না দিলেও যতটা সম্ভব সীমিত রাখা উচিত। এর পরিবর্তে প্রাকৃতিক, তাজা ও পুষ্টিকর খাবার বেছে নিলে শরীরের প্রদাহ কমানো সহজ হয়।
শেষ কথা
ইনফ্ল্যামেশন বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ অনেক সময় আমাদের শরীরে নীরবে কাজ করে এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অনেকেই মনে করেন এটি কমাতে শুধু ওষুধই একমাত্র সমাধান। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসই শরীরের প্রদাহের মাত্রাকে অনেকাংশে প্রভাবিত করে। যদি আমরা নিয়মিত প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করি, তাহলে শরীর নিজেই প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
রঙিন শাকসবজি ও ফলমূলের মধ্যে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন থাকে, যা শরীরের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। একইভাবে হলুদ ও আদার মতো মসলা প্রাকৃতিকভাবে প্রদাহবিরোধী উপাদানে সমৃদ্ধ। স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যেমন বাদাম, তিল বা ভালো মানের তেল শরীরের হরমোন ও কোষের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক। আবার পূর্ণ শস্য ও আঁশযুক্ত খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে, যা শরীরের সামগ্রিক প্রদাহ কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বড় কোনো পরিবর্তনের আগে ছোট ছোট অভ্যাস গড়ে তোলা। প্রতিদিনের খাবারে একটু বেশি শাকসবজি যোগ করা, প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো, এবং প্রাকৃতিক খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়ানো—এই ছোট পরিবর্তনগুলোই দীর্ঘমেয়াদে বড় উপকার এনে দিতে পারে।
অর্থাৎ, যখন আমরা সুষম ও প্রাকৃতিক খাবারকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলি, তখন শরীর ধীরে ধীরে নিজস্ব ভারসাম্য ফিরে পায়। ফলে ইনফ্ল্যামেশন কমে এবং শরীর সুস্থতার পথে এগিয়ে যায়।