Blog
রোজায় ঘুমের সমস্যা কেন বেড়ে যায়?

রমজান মাসে রোজা রাখা নিঃসন্দেহে আত্মিক প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। কিন্তু একই সাথে এই মাসে আমাদের দৈনন্দিন সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সাধারণ সময়ের তুলনায় রাতের ঘুম দেরিতে হয়, কারণ তারাবির নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতে সময় ব্যয় হয়। আবার ভোরে সেহরির জন্য ঘুম ভাঙতে হয়। ফলে শরীরের স্বাভাবিক ঘুম–জাগরণের ছন্দ বা জৈবিক ঘড়ি (Circadian Rhythm) বিঘ্নিত হয়।
যখন ঘুমের সময় কমে যায় বা টুকরো টুকরো হয়ে যায়, তখন ঘুমের মানও নষ্ট হয়। গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে গেলে শরীর ও মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিশ্রাম পায় না। এর ফলে কারও কারও ক্ষেত্রে অনিদ্রা, হালকা ঘুম, মাঝরাতে বারবার জেগে ওঠা কিংবা দিনের বেলা অতিরিক্ত ঝিমুনি দেখা দেয়। বিশেষ করে ইফতারে ভারী খাবার খাওয়া বা রাতে চা–কফি পান করাও ঘুমের ব্যাঘাতকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই কারণেই প্রশ্ন ওঠে—রোজায় ঘুমের সমস্যা কেন বাড়ে এবং কীভাবে তা কমানো যায়। মূল বিষয় হলো, রমজানের পরিবর্তিত সময়সূচির সাথে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সচেতনভাবে রুটিন তৈরি করা দরকার। সঠিক সময় খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, ক্যাফেইন কমানো এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলে ঘুমের সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অর্থাৎ, রোজার মাসে ঘুমের চ্যালেঞ্জ থাকলেও সঠিক পরিকল্পনায় সেটি সামলানো যায়।
রোজায় ঘুমের সমস্যা বাড়ার প্রধান কারণগুলো
১) সেহরির জন্য ভোরে জাগা ও ঘুমের ছন্দ ভাঙা
রোজার সময় সুবহে সাদিকের আগে সেহরি খাওয়ার জন্য আমাদের খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হয়। সাধারণত এই সময়টা আমাদের গভীর ঘুমের (Deep Sleep) অংশ হয়ে থাকে। যখন এই সময়টিতে ঘুম ভেঙে যায়, তখন রাতের স্বাভাবিক ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
আমাদের শরীরে একটি প্রাকৃতিক সময়নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা আছে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম (Circadian Rhythm)। এটি মূলত ২৪ ঘণ্টার একটি জৈবিক চক্র, যা আলো–অন্ধকার, ঘুম–জাগরণ, হরমোন নিঃসরণ এবং শরীরের শক্তির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। রাত গভীর হলে মেলাটোনিন নামের ঘুমের হরমোন বাড়ে, শরীর বিশ্রামের মোডে যায় এবং গভীর ঘুমে প্রবেশ করে। ভোরের দিকে এই গভীর ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ সময়েই কোষ মেরামত ও শক্তি পুনরুদ্ধার হয়।
সেহরির কারণে যদি এই সময়টিতে ঘুম ভেঙে যায়, তাহলে গভীর ঘুমের ধাপ সম্পূর্ণ হয় না। ফলস্বরূপ, ঘুম হালকা হয়ে যায় এবং শরীর সম্পূর্ণ বিশ্রাম পায় না। এর প্রভাব হিসেবে দিনভর ঝিমুনি, মনোযোগের ঘাটতি, ক্লান্তি ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, ঘুমের মোট সময় ঠিক থাকলেও যদি তার ছন্দ ভেঙে যায়, তাহলে ঘুমের মান কমে যায় এবং শরীর সতেজ অনুভব করে না।
২) তারাবি ও রাত জাগা
তারাবির নামাজ ও রমজানকে কেন্দ্র করে নানা সামাজিক আয়োজন স্বাভাবিকভাবেই রাতের সময়কে দীর্ঘ করে দেয়। অনেকেই ইফতার, তারাবি, আড্ডা বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে গিয়ে দেরিতে ঘুমাতে যান। এতে ঘুমের মোট সময় যেমন কমে যায়, তেমনি ঘুমের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মানবদেহের ঘুম কয়েকটি ধাপে বিভক্ত। এর মধ্যে ডিপ স্লিপ (Deep Sleep) হলো সেই সময়, যখন শরীরের কোষ মেরামত হয়, পেশি পুনরুদ্ধার হয় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়। আর REM স্লিপ (Rapid Eye Movement Sleep) হলো সেই ধাপ, যখন মস্তিষ্ক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে, স্মৃতি সংরক্ষণ করে এবং মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করে। দেরিতে শোয়া বা ঘুমের সময় কম হলে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পর্যাপ্ত সময় পায় না।
ফলে দেখা যায়—সকালে ঘুম থেকে উঠলেও পুরোপুরি সতেজ লাগে না, মাথা ঝিমঝিম করে, মনোযোগ কমে যায় এবং সারাদিন অকারণে ক্লান্তি অনুভূত হয়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে শারীরিক শক্তি, মানসিক স্থিতি এবং কাজের দক্ষতা—সবকিছুর ওপরই প্রভাব পড়ে। তাই রোজায় ইবাদত ও সামাজিক সময় উপভোগের পাশাপাশি ঘুমের সময় ও মান ঠিক রাখাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৩) ইফতারে অতিরিক্ত ও ভারী খাবার
ইফতারের সময় দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকার পর আমরা হঠাৎ করে ভারী, তেল–চর্বিযুক্ত বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খেয়ে ফেলি। ভাজাপোড়া খাবার যেমন পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ ইত্যাদিতে তেলের পরিমাণ বেশি থাকে, যা হজম হতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় নেয়। একইভাবে অতিরিক্ত মিষ্টি ও লবণ–মশলাযুক্ত খাবার পাকস্থলীতে অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়ায় এবং হজম প্রক্রিয়াকে চাপের মধ্যে ফেলে।
ফলে ইফতারের কিছু সময় পর বুকজ্বালা, গ্যাস, পেট ভারী লাগা বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। যখন আমরা শোবার কাছাকাছি সময়ে ভারী খাবার খাই, তখন শরীর হজম প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকে—কিন্তু ঘুমের সময় শরীর স্বাভাবিকভাবে বিশ্রাম ও পুনর্গঠনের দিকে যেতে চায়। এই দুই প্রক্রিয়ার সংঘাতে ঘুম গভীর হতে পারে না। অনেক সময় মাঝরাতে এসিডিটি বা গ্যাসের অস্বস্তির কারণে ঘুম ভেঙে যায়।
বিশেষ করে শোবার ঠিক আগে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করলে পাকস্থলীর অ্যাসিড ওপরের দিকে উঠে বুকজ্বালার অনুভূতি তৈরি করতে পারে (যা রিফ্লাক্স হিসেবে পরিচিত)। এ ধরনের অস্বস্তি ঘুমের মান কমিয়ে দেয় এবং পরদিন সকালে ক্লান্তি বাড়ায়। তাই ইফতারে পরিমিত ও সুষম খাবার বেছে নেওয়া এবং শোবার আগে অন্তত ২–৩ ঘণ্টা বিরতি রাখা ঘুম ভালো রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৪) ক্যাফেইন গ্রহণ
ইফতারের পর চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই থাকে, কারণ সারাদিন না খেয়ে থাকার পর গরম এক কাপ চা বা কফি তাৎক্ষণিক সতেজ অনুভূতি দেয়। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন সরাসরি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে। এটি মস্তিষ্কের এমন একটি রাসায়নিক পদার্থ (অ্যাডেনোসিন)–এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যা সাধারণত শরীরকে ক্লান্তির সংকেত দেয় এবং ঘুমের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে।
ক্যাফেইন গ্রহণের পর তা রক্তে শোষিত হয়ে কয়েক ঘণ্টা সক্রিয় থাকে। গড়ে ৬–৮ ঘণ্টা পর্যন্ত এর প্রভাব থাকতে পারে, কখনো কখনো ব্যক্তিভেদে আরও বেশি সময়। ফলে আপনি রাত ৯টায় কফি পান করলে মধ্যরাত পর্যন্ত মস্তিষ্ক পুরোপুরি শান্ত হতে চায় না। এর কারণে ঘুমাতে দেরি হতে পারে, বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে অথবা গভীর ঘুমের (ডিপ স্লিপ) সময় কমে যেতে পারে।
ফলাফল হিসেবে সকালে ঘুম ভাঙার পরও শরীর সম্পূর্ণ বিশ্রামপ্রাপ্ত মনে হয় না, এবং রোজার দিনে ক্লান্তি আরও বাড়ে। তাই রমজানে বিশেষ করে রাতের দিকে ক্যাফেইন কমানো বা এড়িয়ে চলা ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫) পানিশূন্যতা (Dehydration)
দিনভর পানি পান না করলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই পানির ঘাটতির দিকে চলে যায়। রোজার সময় দীর্ঘ সময় পানি না খাওয়ার কারণে শরীর ধীরে ধীরে তরল হারাতে থাকে—ঘাম, প্রস্রাব ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেও পানি বের হয়ে যায়। কিন্তু এই হারানো পানির ঘাটতি সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে শরীরে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে।
পানিশূন্যতা হলে রক্ত কিছুটা ঘন হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে তুলনামূলক বেশি চাপ পড়ে। এর ফলস্বরূপ মাথাব্যথা হতে পারে, কারণ মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে পানির ঘাটতির প্রতি সংবেদনশীল। একইভাবে শরীরে মিনারেল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে পেশিতে টান, ক্র্যাম্প বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এই অস্বস্তি রাতে শোবার সময় বেশি অনুভূত হয়, ফলে ঘুম ভেঙে যেতে পারে বা গভীর ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।
অর্থাৎ পানিশূন্যতা শুধু তৃষ্ণা তৈরি করে না, বরং মাথা ও পেশিতে অস্বস্তি বাড়িয়ে ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকেও ব্যাহত করতে পারে। তাই ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত ও সুষমভাবে পানি পান করা ভালো ঘুম নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৬) দিনের বেলা কম সক্রিয়তা
রোজার সময় অনেকেই মনে করেন, যত কম নড়াচড়া করা যায় তত ভালো—তাহলেই শক্তি বাঁচবে। তাই অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে হাঁটা–চলা, হালকা কাজ বা ব্যায়াম কমিয়ে দেন। প্রথমদিকে এটি যুক্তিসংগত মনে হলেও, বাস্তবে এর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ঘুমের ওপর।
আমাদের শরীরের স্বাভাবিক ঘুমচক্র আংশিকভাবে নির্ভর করে দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তার ওপর। দিনের বেলায় যথেষ্ট নড়াচড়া না হলে শরীরে স্বাভাবিক ক্লান্তি বা “ফিজিক্যাল ফ্যাটিগ” তৈরি হয় না। ফলে রাতে বিছানায় যাওয়ার পর শরীর ঘুমের জন্য প্রস্তুত থাকে না। এতে ঘুম আসতে দেরি হয়, ঘুম হালকা হয়, বা বারবার ভেঙে যায়।
এছাড়া চলাফেরা কম হলে মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায় এবং রক্ত সঞ্চালনও কম সক্রিয় থাকে। হালকা শারীরিক কার্যকলাপ—যেমন ইফতারের পর ১০–১৫ মিনিট হাঁটা—শরীরকে ভারসাম্যে রাখতে সাহায্য করে এবং রাতে ঘুমকে সহজ করে তোলে। তাই রোজায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় না থেকে পরিমিত ও সচেতনভাবে সক্রিয় থাকা ঘুমের মান বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
৭) মানসিক চাপ ও রুটিনের অস্থিরতা
রমজান মাসে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ঘুমের সময় বদলে যায়, খাবারের সময় পরিবর্তিত হয়, পাশাপাশি ইবাদতের জন্য আলাদা সময় বের করতে হয়। এর সঙ্গে অফিস, ব্যবসা বা পারিবারিক দায়িত্বও চলতে থাকে। এই নতুন রুটিনে দ্রুত মানিয়ে নিতে না পারলে অনেকের ভেতরে অচেতনভাবে চাপ তৈরি হয়। কাজ এবং ইবাদতের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে মানসিক টেনশন বাড়তে পারে।
এই মানসিক চাপের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক আছে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের—কর্টিসল, যাকে স্ট্রেস হরমোন বলা হয়। যখন আমরা উদ্বিগ্ন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকি, তখন শরীরে কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়। কর্টিসলের কাজ হলো শরীরকে সতর্ক অবস্থায় রাখা। কিন্তু সমস্যা হলো, এই হরমোন বেশি থাকলে শরীর “বিশ্রাম মোডে” যেতে পারে না।
ঘুম আসার জন্য প্রয়োজন মেলাটোনিন নামের হরমোন, যা শরীরকে শিথিল করে। কর্টিসল বেশি থাকলে মেলাটোনিনের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে—
- ঘুম আসতে দেরি হয়
- ঘুম হালকা হয়
- মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়
- সকালে উঠে ক্লান্ত লাগে
অর্থাৎ মানসিক চাপ শুধু মনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি সরাসরি ঘুমের মানকে প্রভাবিত করে। তাই রমজানে কাজ–ইবাদতের ভারসাম্য বজায় রাখা, সময় ব্যবস্থাপনা করা এবং মানসিকভাবে শান্ত থাকা ভালো ঘুমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোজায় ঘুম কম হলে শরীরে কী প্রভাব পড়ে?
রোজার সময় পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম না হলে তার প্রভাব শুধু ক্লান্তি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি ধীরে ধীরে শরীর ও মনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
প্রথমত, ঘুমের অভাবে শরীর পুরোপুরি বিশ্রাম পায় না, ফলে দিনের বেলা ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়। সহজ কাজেও বেশি সময় লাগে, সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয় এবং কর্মক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে অফিসের কাজ, পড়াশোনা বা ইবাদতে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, সামান্য বিষয়েও রাগ বা বিরক্তি তৈরি হয়। কারণ ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।
তৃতীয়ত, ঘুমের অভাব সরাসরি রক্তে শর্করার ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের ইনসুলিন সেনসিটিভিটি কমে যায়, অর্থাৎ কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দেয়। ফলে রক্তে সুগারের ওঠানামা বাড়ে, যা বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
চতুর্থত, ঘুমের অভাবে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনে পরিবর্তন আসে। গ্রেলিন নামক হরমোন বেড়ে যায়, যা ক্ষুধা বাড়ায়; আর লেপটিন কমে যায়, যা তৃপ্তির অনুভূতি দেয়। এর ফলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয় এবং ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে।
পঞ্চমত, ইমিউন সিস্টেমও ঘুমের ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি হারাতে থাকে। ফলে সর্দি-কাশি বা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং অসুস্থ হলে সুস্থ হতে সময় বেশি লাগে।
অর্থাৎ, রোজায় যদি ঘুমের দিকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তবে শারীরিক শক্তি, মানসিক স্থিতি, হরমোনের ভারসাম্য ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা—সবই প্রভাবিত হয়। তাই রোজার সময় ভালো ঘুম নিশ্চিত করা সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকার একটি অপরিহার্য অংশ।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?
নিচের শ্রেণির মানুষদের ক্ষেত্রে রোজায় ঘুমের সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা দিতে পারে, তাই তাদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকা জরুরি—
বয়স্ক ব্যক্তি: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম স্বাভাবিকভাবেই হালকা হয়ে যায় এবং বারবার ভেঙে যেতে পারে। রোজায় সেহরির জন্য ভোরে ওঠা ও রাতের রুটিন বদলে যাওয়ায় তাদের ঘুম আরও বিঘ্নিত হয়। এতে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা রক্তচাপের ওঠানামার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে ভোগা মানুষ: এদের শরীরে হরমোন ও রক্তে শর্করার ভারসাম্য খুব সংবেদনশীল থাকে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি কমে যেতে পারে এবং রক্তচাপ বা হার্ট রেটেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই ঘুমের মান ঠিক রাখা তাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শিফট–ওয়ার্কার: যারা আগে থেকেই অনিয়মিত সময়সূচিতে কাজ করেন, তাদের সার্কাডিয়ান রিদম (জৈবিক ঘড়ি) অনেক সময় অস্থির থাকে। রোজার সময় নতুন রুটিন যুক্ত হওয়ায় ঘুমের সমস্যা আরও বাড়তে পারে এবং দিনে অতিরিক্ত ঝিমুনি বা মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
যারা নিয়মিত চা/কফি বেশি পান করেন: ক্যাফেইন স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে এবং দীর্ঘ সময় শরীরে সক্রিয় থাকে। রোজার সময় ইফতারের পর বেশি চা বা কফি পান করলে ঘুমাতে দেরি হয়, ঘুম হালকা হয় এবং গভীর ঘুম কমে যায়।
যাদের আগে থেকেই অনিদ্রা আছে: পূর্ব থেকে ঘুমের সমস্যা থাকলে রোজার পরিবর্তিত রুটিন তা আরও তীব্র করতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস, ক্যাফেইন কমানো এবং শোবার পরিবেশ ঠিক রাখা বিশেষভাবে প্রয়োজন।
এই গোষ্ঠীর মানুষদের জন্য রমজানে সঠিক রুটিন ও সচেতনতা ঘুমের মান বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোজায় ভালো ঘুমের জন্য কার্যকর কৌশল
১) নির্দিষ্ট ঘুম – জাগার সময় ঠিক করুন
রমজান মাসে আমাদের দৈনন্দিন সময়সূচি অনেকটাই বদলে যায়—বিশেষ করে ঘুমের ক্ষেত্রে। সেহরির জন্য ভোরে ওঠা এবং রাতে ইবাদত বা অন্যান্য কাজের কারণে ঘুমের সময় এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। তাই এই সময়টায় একটি স্থির ও পরিকল্পিত রুটিন তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
যদি আপনি প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করেন, তাহলে শরীরের ভেতরের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম ধীরে ধীরে নতুন রুটিনের সাথে মানিয়ে নিতে পারে। এই সার্কাডিয়ান রিদমই ঠিক করে দেয় কখন শরীর ঘুমাতে চাইবে, কখন জাগতে চাইবে, এবং কখন শক্তি বেশি থাকবে। সময়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে মেলাটোনিনের মতো ঘুমের হরমোন নির্দিষ্ট সময়ে নিঃসৃত হয়, ফলে ঘুম গভীর ও আরামদায়ক হয়।
কিন্তু যদি প্রতিদিন ঘুমের সময় বদলাতে থাকে—একদিন দেরিতে, আরেকদিন খুব তাড়াতাড়ি—তাহলে শরীর বিভ্রান্ত হয়ে যায়। এতে ঘুম হালকা হয়, মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায় এবং দিনভর ক্লান্তি ও ঝিমুনি অনুভূত হয়। তাই রমজানে পুরোপুরি আগের রুটিন না রাখা গেলেও, নিজের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা এবং সেটি মেনে চলার চেষ্টা করাই ভালো ঘুম ও ভালো শক্তি ধরে রাখার অন্যতম চাবিকাঠি।
২) ছোট্ট “ পাওয়ার ন্যাপ ”
দুপুরে ২০–৩০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত ঘুমকে আরবি পরিভাষায় কায়লুলা বলা হয়। এটি দীর্ঘ দুপুরের ঘুম নয়, বরং স্বল্প সময়ের একটি হালকা বিশ্রাম। এই সময়টুকু ঘুমালে শরীর ও মস্তিষ্ক সামান্য রিকভার করার সুযোগ পায়, কিন্তু গভীর দীর্ঘ ঘুমে ঢুকে যায় না—ফলে রাতে স্বাভাবিক ঘুমের সময় ব্যাহত হয় না।
২০–৩০ মিনিটের পাওয়ার ন্যাপ করলে—
- মস্তিষ্কের ক্লান্তি কমে
- মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বাড়ে
- বিকেলের ঝিমুনি দূর হয়
- মানসিক চাপ কিছুটা কমে
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বল্প সময়ের এই ঘুম এনার্জি রিস্টোর করতে সাহায্য করে, কিন্তু ৪৫ মিনিট বা তার বেশি ঘুমালে শরীর গভীর ঘুমের পর্যায়ে ঢুকে যেতে পারে। তখন উঠে সতেজ লাগার বদলে অলসতা বা মাথা ভার লাগতে পারে এবং রাতে ঘুম আসতেও দেরি হতে পারে।
বিশেষ করে রোজার সময়, যখন ভোরে সেহরির জন্য ঘুম ভাঙে, তখন দুপুরে ২০–৩০ মিনিটের কায়লুলা শরীরের ঘুমঘাটতি আংশিক পূরণ করতে পারে—রাতে গভীর ঘুমের ক্ষতি না করেই।
৩) ইফতারে হালকা ও সুষম খাবার
ইফতারে সঠিকভাবে খাবার গ্রহণ করলে হজম ভালো থাকে এবং রাতে ঘুমের ব্যাঘাত কম হয়।
প্রথমে পানি ও ১–২টি খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা শরীরের জন্য উপকারী। সারাদিন না খেয়ে থাকার পর পানি দ্রুত শরীরকে হাইড্রেট করে এবং খেজুর প্রাকৃতিকভাবে রক্তে শর্করা ধীরে বাড়িয়ে শক্তি দেয়। এতে শরীর হঠাৎ ভারী বা অস্বস্তিকর অনুভব করে না।
এরপর হালকা ফল বা স্যুপ নেওয়া ভালো। ফল ও স্যুপ সহজপাচ্য এবং পেটকে প্রধান খাবারের জন্য প্রস্তুত করে। এতে হজম প্রক্রিয়া ধীরে ও স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়, ফলে এসিডিটি বা গ্যাসের ঝুঁকি কমে।
ভাজাপোড়া সীমিত রাখা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত তেল–ঝাল খাবার হজমে চাপ সৃষ্টি করে এবং বুকজ্বালা বা অস্বস্তি বাড়াতে পারে। এগুলো বেশি খেলে রাতে ঘুমের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
সবশেষে, শোবার অন্তত ২–৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা উচিত। এতে খাবার হজমের জন্য যথেষ্ট সময় পায় এবং পূর্ণ পেটে ঘুমাতে হয় না। পেট হালকা থাকলে ঘুম গভীর ও স্বস্তিদায়ক হয়।
৪) ক্যাফেইন সীমিত রাখুন
ইফতারের পর চা–কফি কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয় মূলত ক্যাফেইনের প্রভাবের কারণে। চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে এবং শরীরকে সতর্ক অবস্থায় রাখে। এর প্রভাব কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে—অনেক ক্ষেত্রে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত। তাই রাত ৯টার পর চা–কফি পান করলে ঘুমাতে দেরি হওয়া, হালকা ঘুম হওয়া বা বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
রোজার সময় এমনিতেই ঘুমের সময় কমে যায়, কারণ সেহরির জন্য ভোরে উঠতে হয়। এর সাথে যদি রাতে ক্যাফেইন নেওয়া হয়, তাহলে শরীর প্রয়োজনীয় গভীর ঘুম (Deep Sleep) পায় না। ফলে পরের দিন বেশি ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া ও বিরক্তির প্রবণতা বাড়তে পারে।
তাই ঘুমের মান ঠিক রাখতে ইফতারের পর চা–কফির পরিমাণ সীমিত রাখা ভালো। বিশেষ করে রাতের শেষ দিকে ক্যাফেইন এড়িয়ে চললে শরীর স্বাভাবিকভাবে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে পারে এবং রোজার সময়ও সুস্থ ও সতেজ থাকা সহজ হয়।
৫) ধাপে ধাপে পানি পান
ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ৮–১০ গ্লাস পানি একসাথে না খেয়ে ধাপে ধাপে পান করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শরীর একবারে অতিরিক্ত পানি শোষণ করতে পারে না; এতে পানি দ্রুত প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায় এবং প্রকৃত হাইড্রেশন হয় না। তাই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো—ইফতারে ১–২ গ্লাস পানি দিয়ে শুরু করা, এরপর ইফতার ও রাতের খাবারের মাঝে অল্প অল্প করে পানি পান করা, এবং সেহরির আগে আরও ২–৩ গ্লাস পানি পান করা।
এইভাবে ভাগ করে পানি পান করলে শরীর ধীরে ধীরে পানি শোষণ করতে পারে এবং সারাদিনের পানির ঘাটতি পূরণ হয়। এতে রাতের বেলা মাথাব্যথা, বুকজ্বালা বা অতিরিক্ত তৃষ্ণার মতো অস্বস্তি কমে। পাশাপাশি শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যও বজায় থাকে, যা ঘুমের মান ভালো রাখতে সাহায্য করে।
৬) শোবার আগে স্ক্রিন টাইম কমান
মোবাইল, টিভি, ল্যাপটপ বা ট্যাবলেটের স্ক্রিন থেকে যে নীল আলো (Blue Light) বের হয়, তা আমাদের মস্তিষ্ককে “দিন এখনও শেষ হয়নি” এমন সংকেত দেয়। স্বাভাবিকভাবে সন্ধ্যার পর শরীরে মেলাটোনিন নামের একটি হরমোন তৈরি হতে শুরু করে, যা ঘুমের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করে। কিন্তু শোবার আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে এই নীল আলো মেলাটোনিনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়।
ফলে কী হয়?
- ঘুম আসতে দেরি হয়
- ঘুম হালকা হয়
- বারবার ঘুম ভেঙে যায়
- সকালে ক্লান্ত লাগে
এ কারণেই ঘুমানোর অন্তত ৪৫–৬০ মিনিট আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টায় বই পড়া, হালকা দোয়া বা জিকির করা, কিংবা শান্ত পরিবেশে কিছু সময় কাটানো ভালো। এতে শরীর স্বাভাবিকভাবে মেলাটোনিন তৈরি করতে পারে এবং ঘুম গভীর ও আরামদায়ক হয়।
৭) ঘুমের পরিবেশ ঠিক রাখুন
ঘুমের মান ভালো রাখতে পরিবেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঘর অন্ধকার ও নীরব থাকা গভীর ঘুমের জন্য খুব প্রয়োজনীয়। আলো থাকলে আমাদের মস্তিষ্ক দিন মনে করে এবং ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন কম নিঃসরণ হয়। তাই শোবার সময় ঘরের লাইট নিভিয়ে বা খুব হালকা আলো ব্যবহার করা ভালো। একইভাবে অতিরিক্ত শব্দ ঘুমের ধারাবাহিকতা ভেঙে দেয়, ফলে ঘন ঘন ঘুম ভাঙতে পারে। শান্ত পরিবেশ গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমে সহায়তা করে।
হালকা ঠান্ডা তাপমাত্রা ঘুমের জন্য বেশি উপযোগী। খুব গরম পরিবেশে শরীর আরাম পায় না, ঘাম হয় এবং অস্থিরতা বাড়ে। আবার অতিরিক্ত ঠান্ডাও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। মাঝামাঝি আরামদায়ক, হালকা ঠান্ডা পরিবেশে শরীর দ্রুত রিল্যাক্স করে এবং গভীর ঘুম সহজে আসে।
আরামদায়ক বিছানা ঘুমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শক্ত বা অস্বস্তিকর বিছানায় শরীর ঠিকভাবে শিথিল হতে পারে না, ফলে কোমর বা ঘাড়ে ব্যথা তৈরি হয় এবং ঘুমের মান কমে যায়। নরম কিন্তু সাপোর্টিভ ম্যাট্রেস ও আরামদায়ক বালিশ শরীরকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বিশ্রাম নিতে সাহায্য করে।
এই তিনটি বিষয় ঠিক রাখলে ঘুম আরও গভীর, স্বস্তিদায়ক এবং পুনরুজ্জীবিতকারী হয়।
৮) হালকা স্ট্রেচিং ও শ্বাস – প্রশ্বাস ব্যায়াম
শোবার আগে ৫–১০ মিনিট গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন বা হালকা স্ট্রেচিং করলে শরীর ও মন ধীরে ধীরে বিশ্রামের মোডে চলে যায়। সারাদিনের কাজ, মানসিক চাপ ও শারীরিক টান আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় অবস্থায় রাখে, যাকে “ফাইট অর ফ্লাইট” অবস্থা বলা হয়। গভীর শ্বাস নেওয়া সেই উত্তেজিত অবস্থাকে কমিয়ে শরীরকে শান্ত করে এবং “রেস্ট অ্যান্ড রিল্যাক্স” অবস্থায় নিয়ে যায়। এতে হৃদস্পন্দন ধীরে আসে, রক্তচাপ কিছুটা কমে এবং মস্তিষ্ক ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয়।
একইভাবে, হালকা স্ট্রেচিং পেশির জমে থাকা চাপ কমায়, রক্তসঞ্চালন উন্নত করে এবং শরীরের শক্তভাব দূর করে। যখন শরীর আরাম অনুভব করে, তখন ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন নিঃসরণ সহজ হয়। ফলে ঘুম তাড়াতাড়ি আসে এবং গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন হয়। নিয়মিত এই ছোট অভ্যাসটি চর্চা করলে ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
৯) সেহরিতে ভারী, ঝাল – লবণাক্ত খাবার কমান
এ ধরনের খাবার—বিশেষ করে অতিরিক্ত ঝাল, লবণাক্ত বা তেলযুক্ত খাবার—শরীরে পানির চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। বেশি লবণ শরীর থেকে পানি টেনে নেয়, ফলে তৃষ্ণা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আবার ঝাল ও ভারী খাবার পেটের ভেতর অস্বস্তি, গ্যাস বা বুকজ্বালা সৃষ্টি করতে পারে। এসব কারণে রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে বা গভীর ঘুম নষ্ট হয়।
অর্থাৎ, সেহরি বা রাতে এমন খাবার বেশি খেলে শরীর স্বস্তিতে থাকতে পারে না। তৃষ্ণা, অম্বল বা পেটের অস্বস্তি ঘুমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করে, যার ফলে পরদিন রোজা রেখে ক্লান্তি আরও বেশি অনুভূত হয়। তাই হালকা, পরিমিত ও সহজপাচ্য খাবার নির্বাচন করলে রাতের ঘুম তুলনামূলক ভালো থাকে।
১০) নিয়মিত হালকা হাঁটা
ইফতারের পর আমাদের পেট একসাথে দীর্ঘ সময়ের উপবাস ভেঙে খাবার গ্রহণ করে। এই সময় হজমতন্ত্র হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে। যদি আমরা খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়ি বা একদম বসে থাকি, তাহলে খাবার ধীরে হজম হয়, গ্যাস ও অস্বস্তি বাড়তে পারে।
ইফতারের প্রায় ৩০–৪৫ মিনিট পর ১০–১৫ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং পেটের পেশিগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে। এতে হজম প্রক্রিয়া সহজ হয়, খাবার দ্রুত ভেঙে যায় এবং পেট ভারী লাগা কমে। পাশাপাশি হালকা হাঁটা রক্তে শর্করার মাত্রাও স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে, যা রোজার পর শরীরের জন্য উপকারী।
এছাড়া সন্ধ্যার এই হালকা শারীরিক নড়াচড়া শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে ক্লান্ত করে, মানসিক চাপ কমায় এবং স্নায়ুকে শান্ত করে। ফলে রাতে শোবার সময় ঘুম আসা সহজ হয় এবং ঘুমের মানও উন্নত হয়। অর্থাৎ, অল্প সময়ের এই সহজ অভ্যাসটি একসাথে হজম ও ঘুম—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শেষ কথা
রোজার সময়ে ঘুমের সমস্যা হঠাৎ করে তৈরি হয় না; বরং এটি কয়েকটি পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল। সেহরির জন্য ঘুম ভেঙে যাওয়া, ইফতারে ভারী ও তেল–মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া, রাতের বেলা চা–কফি পান করা এবং পর্যাপ্ত পানি না খাওয়ার মতো বিষয়গুলো ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দকে বিঘ্নিত করে। ফলে গভীর ও মানসম্মত ঘুম পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
তবে সুখবর হলো—সচেতন পরিকল্পনা ও কিছু নিয়ম মেনে চললে এই সমস্যাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ইফতারে হালকা ও সুষম খাবার নির্বাচন করলে হজমের চাপ কমে এবং রাতের অস্বস্তি কম হয়। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর পানিশূন্য হয় না, যা ঘুমের মান ভালো রাখতে সাহায্য করে। একই সময়ে শোওয়া–ওঠার অভ্যাস এবং শোবার আগে মানসিকভাবে নিজেকে শান্ত রাখা—এই দুটি বিষয়ও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
রোজা শুধু ইবাদতের সময় নয়; এটি আত্মসংযম ও শরীরের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনারও সুযোগ। যখন ঘুম ঠিক থাকে, তখন মন থাকে স্বচ্ছ, শরীরে থাকে শক্তি, এবং ইবাদতে মনোযোগ বাড়ে। তাই সুস্থ ও পর্যাপ্ত ঘুম মানেই একটি প্রাণবন্ত, মনোযোগী ও শক্তিশালী রমজান।











